শব্দের আধিক্য আজকের মতো এত প্রবল কোনও কালেই ছিলো না। ঊষালগ্ন থেকে নিশীথিনী পর্যন্ত আমরা অবিরাম শব্দতরঙ্গে ভেসে চলছি। যানবাহনের শব্দ, মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন, টেলিভিশনের আওয়াজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতি এবং মানুষের ব্যস্ত কথাবার্তায় আমাদের চারপাশ আবদ্ধ। এই শব্দের পৃথিবীতে একটি জিনিস ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে, আর তা হলো নীরবতা।টেকনোলজি ও ট্রাফিকের এই যুগে নীরবতা যেন হারিয়ে যাওয়া সুরের রূপ ধারণ করেছে।
নীরবতা বলতে আমরা সাধারণত শব্দহীনতাকে বুঝি। যদিও নীরবতার প্রকৃত অর্থ ভিন্ন। নীরবতা বাইরের পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের মনের ভেতরেরও একটি শান্ত অবস্থা। নীরবতা বা শব্দহীনতা হলো কান দিয়ে অনুভব করার বিষয়।অন্যদিকে; প্রকৃত নীরবতা হলো মন দিয়ে উপলব্ধি করা। যিনি নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারেন এবং নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পারেন প্রকৃতার্থে তিনিই নীরবতার স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। দুঃখের বিষয়; আধুনিক জীবনের গতি আমাদের সেই সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।
আগেকার মানুষের জীবনে অবসর ছিল। সন্ধ্যা নামলে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত, নদীর ধারে বসে বাতাসের শব্দ শুনত কিংবা জীবন নিয়ে ভাবত। প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা সত্ত্বেও তখনকার মানুষেরা আমাদের চেয়ে মানসিক প্রশান্তি ও নিস্তব্ধতাকে বেশি উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আজ আমরা অসংখ্য তথ্যের নাগাল পেয়েছি, কিন্তু নিজের মনকে বোঝার সময় হাতে নেই। যার ফলে যদিও জ্ঞান বাড়ছে তবে আত্মপরিচয় সংকুচিত হচ্ছে।
প্রযুক্তির উন্নতি মানুষের জীবনকে যে সহজ করেছে এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগকে খণ্ডিতও করেছে। কোনও বার্তা, ভিডিয়ো,বিজ্ঞাপন কিংবা কোনও সংবাদ আমাদের মনকে মুহূর্তে অন্যদিকে টেনে নিয়ে যায়। ফলে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে কোনও একটি চিন্তার সঙ্গে থাকতে পারছি না। গভীর চিন্তার জায়গা নিয়েছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ এখন ভাবার চেয়ে দ্রুত উত্তর দিতে অভ্যস্ত।
এই পরিবর্তনের একটি বড় প্রভাব পড়েছে সৃজনশীলতার ওপর। সাহিত্য, শিল্প, দর্শন কিংবা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগ এবং গভীর চিন্তার প্রয়োজন হয়। অনেক বড় বড় সৃষ্টির পেছনে ছিল একান্ত নির্জনতা। মানুষ তখন বাইরের কোলাহল থেকে দূরে সরে নিজের ভেতরে অবস্থান করছিল এবং তখনই জন্ম নিয়েছিল অসংখ্য নতুন ধারণা ও উদ্ভাবন। আজকের পৃথিবীতে সেই নির্জনতার পরিসর সংকুচিত হবার মুখে। আমরা অন্যের সাথে সংযুক্ত থাকলেও নিজের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও নীরবতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আধুনিক জীবনে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকলেও একটিকে উপেক্ষা করা যায় না—মানুষের অন্তর্গত বিশ্রামের অভাব। শরীর যেমন বিশ্রাম চায়, মনও তেমনি বিশ্রাম চায়। কিন্তু আমরা যেভাবে শরীরের ক্লান্তিকে বুঝতে পারি, মনের ক্লান্তিকে সেভাবে বুঝতে পারছি না। প্রতিদিনের উদ্বেগ ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে মনকে নতুন করে সাজানোর একমাত্র উপায় নীরবতা।নীরব মুহূর্তে মানুষ তার অনুভূতি চিনতে পারে, ভুল উপলব্ধি করতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
সমস্যা হলো, বর্তমান সমাজ নীরবতাকে নেতিবাচকভাবে দেখে। যিনি বেশি কথা বলেন না, তেনাকে অনেকেই আত্মবিশ্বাসহীন কিংবা সামাজিকভাবে দুর্বল বলে মনে করেন। যদিও নীরবতা দুর্বলতার স্পষ্ট লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি গভীরতা, পরিপক্বতা এবং আত্মসচেতনতার পরিচয়ও বহন করে। সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। কখনও কখনও কিছুসময়ের চিন্তাশীল নীরবতা অসংখ্য শব্দের চেয়েও বেশি অর্থবহ হতে পারে।
প্রকৃতির দিকে তাকালেও আমরা নীরবতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি। পাহাড়ের স্থিরতা, নদীর গভীর প্রবাহ, রাতের আকাশ কিংবা ভোরের আলোর সৌন্দর্য উপলব্ধি করার জন্য চোখের পাশাপাশি শান্ত মনেরও প্রয়োজন। প্রকৃতি থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, জগতের বড় বড় পরিবর্তনগুলো খুব নীরবেই ঘটে। বীজ মাটির নিচে অঙ্কুরিত হয়, গাছ ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে এবং ঋতু পরিবর্তিত হয় পূর্ব-ঘোষণা ছাড়াই। আশ্চর্যের বিষয় যে, এই নীরব ঘটনাগুলোই জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।
মানবসম্পর্কেও নীরবতার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। সব অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য শব্দের প্রয়োজন হয় না, খাঁটি সম্পর্কে নীরবতাই অনেক কথা বলে দেয়। অনেক সময় নীরব উপস্থিতি, সহানুভূতিশীল দৃষ্টি কিংবা নিশ্চুপ সঙ্গ মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে। খাঁটি সম্পর্কের ভিত্তি বিশ্বাস ও অনুভূতি, মুখের কথায় গড়া সম্পর্ক বেশিদিন টিকে না। তবে যে সম্পর্ক নীরবতাকেও ধারণ করতে পারে, তার ভিত্তি অনেক গভীর।
আজকের পৃথিবীতে নীরবতা সংরক্ষণ করা এক ধরনের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ বা উদ্দেশ্য প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির সাথে একটি সুস্থ ও সুষম সম্পর্ক গড়ে তোলা। প্রতিদিন কিছু সময় নিজের জন্য রাখা, অপ্রয়োজনীয় শব্দ থেকে দূরে থাকা, বই পড়া, প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া কিংবা চিন্তা করার মতো অভ্যাস মানসিক জগৎকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে এবং সুন্দর চিন্তাভাবনা করতে নীরবতা আমাদের ভীষণ প্রয়োজন।
সভ্যতা যত এগোচ্ছে, শব্দের পরিমাণ তত বাড়ছে। বাহ্যিক বিকাশ জীবনের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু জীবনের প্রকৃত সার্থকতা ও স্থায়িত্ব আসে অভ্যন্তরীণ পরিপক্বতার হাত ধরে। আর অভ্যন্তরীণ পরিপক্বতার অন্যতম উৎস হলো নীরবতা। যে সমাজ নীরবতার মূল্য বোঝে না, সে সমাজ থেকে ক্রমান্বয়ে চিন্তার ক্ষমতা শূন্য হয়ে পড়ে। তখন সেখানে থাকে তথ্য--প্রজ্ঞা থাকে না এবং থাকে যোগাযোগ--আত্মিক সংযোগ থাকে না।
তাই আজ যখন পৃথিবী ক্রমশ দ্রুত, ব্যস্ত এবং শব্দমুখর হয়ে উঠছে, তখন নীরবতার গুরুত্ব নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। কারণ; নীরবতা আত্মঅন্বেষণের একটি পথ। নীরবতার মাধ্যমেই মানুষ তার মনের ইতিবাচক শক্তিকে আবিষ্কার করতে পারে। শব্দ আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে এবং নীরবতা নিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যিনি নিজের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন তিনিই প্রকৃতার্থে জীবনকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।
