শ্রাবণ মাস। আকাশ জুড়ে মেঘের ঘোলাটে ছায়া,কম্বলের মতো মেঘের শরীরে জড়ানো । রিমিঝিম বৃষ্টি পড়ছে, যেন উপর থেকে কেউ রুপার চুড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছে।
কামালপুর স্টেশনের পাশে রেললাইনের ধারে টিনের ঘর। ওখানেই থাকে রুপা। বাবা বিরসা মুন্ডা, মা বনশ্রী। কোল সম্প্রদায়। বাপ-দাদার ভিটা নাই। তাই রেলের জায়গাতেই বসবাস।
রুপা। বয়স চৌদ্দ বছর । গায়ের রং কাঁচা হলুদের মতো। চোখ দুটো হরিণের মতো চঞ্চল। চুল ছোট করে ছাঁটা। ছেলে-মেয়ে সবাইকে দৌড়ে হারিয়ে দেয়। গাছে উঠা, হাই জাম্প, ফুটবল — সবকিছুতেই ফাস্ট হয় রুপা। এলাকার সবাই ডাকে "দুরন্ত রুপা,দস্যি মেয়ে"।
রেললাইনের পাশেই ক্যানেল। বর্ষায় পানি থইথই। আজ ক্যানেলে মাছ ধরার ধুম। ছেলেপুলে, বুড়ো-বুড়ি সবাই নেমেছে। রুপাও নেমেছে সঙ্গীদের সাথে।
"এই রুপা, ওপারে যা তো। বড়ো মাছ আছে।"
"ধুর, আমি একাই ধরবো।"
বলেই দৌড় দেয় । একবার রেললাইন ক্রস করে ওপারে যায়, আবার এপারে ফিরে আসে। এটা নিত্যদিনের খেলা। ট্রেন আসলে "প-প-প" শব্দ শুনলেই সবাই লাফ দিয়ে সরে যায়,নিরাপদ আশ্রয়ে।
আজও তাই। হঠাৎ "প-প-প" শব্দ হলো। মালগাড়ি। সবাই ছুটলো নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে।
রুপাও ছুটলো। কিন্তু পা বেঁধে যায় রেললাইনের সাথে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়।
এক সেকেন্ড।
শুধু এক সেকেন্ড।
চাকার শব্দ। রক্তের ছিটা। আর একটা আর্তনাদ যা বৃষ্টির শব্দকেও ছাপিয়ে যায়।
ট্রেন চলে গেল। রেখে গেল রুপার বাম পা — হাঁটু থেকে নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। ঠিক দুটো রেললাইনের মাঝখানে। যেমন গরু জবাই করলে পা পড়ে থাকে, তেমনই। পড়ে আছে একটা বিচ্ছিন্ন সাদা ধবধবে পা।
হুলুস্থুল। চিৎকার। "রুপা রে..."
ওপাড়ার মুসলিম ছেলে লিখন। বয়স সতেরো। গ্রামের মাতুব্বরের ছেলে। গায়ে শক্তি। সে দৌড়ে এসে রক্তাক্ত রুপাকে কোলে তুলে নেয়। দৌড় দেয় শহরের দিকে।
রুপার শরীর তুলার মতো হালকা। কিন্তু রক্তে ভিজে ভারী হয়ে গেছে। লিখনের সাদা গেঞ্জি লাল হয়ে গেছে।
"হাসপাতাল... তাড়াতাড়ি..."
বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাড়িয়ে লিখন দৌড়াচ্ছে। রুপা জ্ঞান হারায়নি,চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে লিখনের দু'হাতের উপর। । শুধু বিড়বিড় করছে, "মা... মা..."
শহরের সরকারি হাসপাতাল। ভর্তি হয়। ডাক্তার বলে, "অনেক রক্ত গেছে। পা বাঁচানো যাবে না। রক্ত লাগবে"
লিখন না বুঝেই রক্ত দেওয়ার জন্য বেডের উপর শুয়ে পড়ে। ডাক্তার রক্তের গ্রুপ জানতে চায়। এর আগেও দুবার রক্ত দিয়েছে লিখন। সে রক্তদানকারী প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র সদস্যও। রুপার রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে জানে, বি পজেটিভ। সুতরাং লিখনের রক্তের গ্রুপের সাথে মিলে যায়। ডাক্তার স্বস্তি পায়। দুজনকে পাশাপাশি বেডে শুয়ায়ে দেয়।
ওদিকে রেললাইনে। রুপার মা বনশ্রী এসেছে। কুড়িয়ে নিয়েছে মেয়ের কাটা পা। বুকে জড়িয়ে কাঁদছে। "আমার মা রে... আমার সোনা রে..."
আদিবাসী পাড়ার লোকজন ভিড় করেছে। রেল পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে সরাচ্ছে। বৃষ্টি থামছে না,আকাশ যেন ছিদ্র হয়ে গেছে, টিপটপ পড়তেই আছে ।
হাসপাতালেও ভিড়। "রুপা এক্সিডেন্ট করেছে।"
সবাই জানে রুপাকে। চঞ্চল, সুন্দরী, দুরন্ত। যে মেয়ে কালকেও ফুটবলে গোল দিয়েছে প্রতিপক্ষকে। আজ সে বিছানায়।
অপারেশন হয়। বাম পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ। ক্র্যাচ। হুইলচেয়ার।
রুপা প্রথমে আয়নায় নিজেকে দেখে নাই। তিন দিন পর দেখলো। তারপর তিন দিন কিছু খায়নি। শুধু জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখেছে।
লিখন রোজ আসতো। ফল নিয়ে, বই নিয়ে। "রুপা, কাঁদিস না। তুই তো দুরন্ত। তুই পারবি।"
রুপা বলতো, "আমি এখন খোঁড়া লিখন। কে আমাকে নিয়ে খেলবে?"
"আমি খেলবো।" লিখন হাসতো।
ধীরে ধীরে। বৃষ্টির মতো, নীরবে। রুপা আর লিখনের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। তারপর ভালোবাসা।
লিখন বলে, "তোর একটা পা নাই তো কি? তোর মনটা তো দুইটা পায়ের চেয়েও জোরে দৌড়ায়।"
রুপা বলে, "তুই মুসলমান। আমি আদিবাসী। সমাজ মানবে?"
লিখন চুপ করে যেত।
রুপা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো। ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটে। কিন্তু মাথা উঁচু।
এই সময়েই ঝামেলা শুরু।
রুপার বড় বোন রুমা। সে যাত্রাপালা করে। বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে নাচে, অভিনয় করে। টাকা নেয়। সমাজের চোখে "ভালো না"। অথচ রুমার নাচে শতশত মানুষ মঞ্চ সামনে করে বাহবা দেয়,নাচানাচি করে। এরাও সমাজের বড়ো অংশ।
লিখনের বাড়ি গ্রামের মাতুব্বর বাড়ি। লিখনের বাবা বলে, "খোঁড়া মেয়ে। আবার আদিবাসী। আবার বোন যাত্রা করে। আমার ছেলের সাথে বিয়ে? অসম্ভব।"
গ্রামে সালিশ বসপ। মণ্ডল-মাতুব্বররা বলে, "লিখন, ভুলে যাও। নাহলে জাত যাবে। তোমার বাবার মানসম্মান থাকবে না।
লিখন বলে, "আমি রুপাকে ভালোবাসি, ওকেই বিয়ে করবে।"
লিখনের বাবা বলে,
"তাহলে বাড়ি ছাড়,আমার বাড়ি তোর জায়গা হবে না ।"
সত্যি সত্যি লিখন বাড়ি ছাড়ে। ঢাকায় চলে যায় । গার্মেন্টসে কাজ নেয়,বস্তিতে থাকে ।
রুপা একা। ক্র্যাচ আর জেদ তার একমাত্র সঙ্গী।
শ্রাবণ আবার আসে । রিমিঝিম বৃষ্টি।
রুপা ক্র্যাচ নিয়ে ক্যানেলের পাড়ে বসে। বৃষ্টির পানি পায়ে লাগে। যে পা নাই, সেখানে চিনচিন ব্যথা।
সে বিড়বিড় করে, "লিখন, তুই বলেছিলি আমার মন দুই পায়ের চেয়ে জোরে দৌড়ায়। দেখ, আমি দৌড়াবো।"
সে লেখাপড়া শুরু করে,আবারও স্কুলে যেতে শুরু করে । রাত জেগে জেগে লেখাপড়া করে। ডিসি এবং জেলা শিক্ষা অফিসারের নজরে পড়ে। সরকারি সাহায্য, প্রতিবন্ধী ভাতা, আদিবাসী কোটা — সবই এখন রুপার দখলে।
বছর ঘোরে। রুপা এসএসসি-তে ফার্স্ট। এইচএসি-তে ফার্স্ট। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এখানেও জেদি মেয়ের জেদের সাথে কোটা যোগ হয়।
লিখনের সাথে যোগাযোগ নাই। শুধু মাঝে মাঝে চিঠি। "ভালো আছি। তুই?" এটুকুই।
দেখতে আট বছর পার হয়ে যায়।
রুপা এখন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার। প্রতিবন্ধী ও আদিবাসী কোটায় প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা,কলেজ শিক্ষক । অফিসে তার টেবিলে নেমপ্লেট — "রুপা মুন্ডা,প্রভাষক "।
গায়ে শাড়ি। পায়ে আর্টিফিশিয়াল লেগ। মাথা উঁচু। চোখে সেই আগের দুরন্তপনা নেই। আছে শান্ত শিষ্ট ভদ্র ও গভীর জলের মতো দুটো চোখ।
সে কামালপুরে ফিরে। গ্রামের মানুষের সামনে আসে,সবাই বাহবা দেয়, মেয়ে একখান । মণ্ডল-মাতুব্বররা সম্মান করে ।
একদি রুপা মাইক হাতে দাঁড়ায়। "চাচারা, আমি সেই খোঁড়া মেয়ে। যাকে আপনারা বলেছিলেন জাত যাবে। আজ আমি আপনাদের এলাকার শিক্ষিত একজন মানুষ। শিক্ষা দিই ছেলেমেয়েদের।
সবাই চুপ। বৃষ্টির মতো নীরবতা।
"আর আমি লিখনকে বিয়ে করবো। সে মুসলিম, আমি আদিবাসী। তাতে কার কি? সংবিধান আমাকে অধিকার দিয়েছে।"
মাতুব্বর বলে, "এটা হয় না মা।"
রুপা হাসে। "হয়। কারণ আমি রুপা। যে এক পা হারিয়েও দৌড়াতে শিখেছে এবং দৌড়াতে পারবে বাকিটা জীবন। "
লিখনকে খুঁজে বের করে রুপা। ঢাকার গার্মেন্টসে। এখন সে সুপারভাইজার।
রুপা খোঁজে খোঁজে হাজির হয় সেই গার্মেন্টসে যেখানে চাকরি করে লিখন। লিখন প্রথমে চিনতে পারেনি।
তারপর বলে-
"রুপা? তুই?"
"হ্যাঁ। তোর সেই দুরন্ত রুপা। এক পা কম, কিন্তু জেদ ডবল বলে হাহাহা করে হাসে।"
লিখনের চোখে পানি,আনন্দে অভিমানে । "আমি তো কিছুই করতে পারিনি তোর জন্য।"
"তুই সেদিন কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলি। ওইটাই সবচেয়ে বড় কাজ।"
সেই রাতে দুজন ছাদে বসে। ঢাকার আকাশে বৃষ্টি।
লিখন বলে, "ভয় করে রুপা।"
"কিসের ভয়?"
"সমাজের।"
রুপা লিখনের হাত ধরে। "সমাজ মানে মানুষ। আর মানুষ বদলায়। আর আমরাও বদলাবো,বদলাবো সনাজটাকে।"
বিয়ে হয়। ছোট করে। রেজিস্ট্রি বিয়ে।
কামালপুরের মণ্ডলরা আসেনি। শুধু বনশ্রী আর বিরসা কেঁদেছে। আনন্দের কান্না।
বিয়ের পর রুপা প্রথমবার ক্যানেলের পাড়ে যায় লিখনকে নিয়ে। বৃষ্টি পড়ছে। দুজনেরই ভালো পোশাক ভিজতে থাকে। ওদিকে আশপাশের সবাই দেখতে থাকে। ওদের সুন্দর ভরাট শরীরে লাল-সবুজের পোশাক ঝলমল করে।
রুপা বলে, "মনে আছে? এখানেই আমার পা গিয়েছিল।"
লিখন বলে, "আর এখান থেকেই তোর নতুন জীবন শুরু।"
রুপা ক্র্যাচ ফেলে দেয়। আর্টিফিশিয়াল পা নিয়ে দাঁড়াই। "দেখ, আমি দাঁড়াতে পারি।"
তারপর হাসে, দজনেই বৃষ্টি ভেজা মেঘলা দিনে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে হাসে। সেই আগের মতো। প্রজাপতির মতো এবং একজোড়া কবুতরের মতো। সরকারি সহযোগিতায়, কামালপুরে রুপার নামে একটা স্কুল তৈরি করা হয়েছে । "রুপা প্রতিবন্ধী ও আদিবাসী বিদ্যালয়"।
বর্ষাকালে বাচ্চারা ক্যানেলে মাছ ধরে। রুপা গিয়ে বলে, "সাবধান। রেললাইন থেকে দূরে থাকবা।"
রেললাইনের মাঝখানে এখন আর রক্ত নাই। আছে ফুল। রুপা নিজে লাগিয়েছে।
লিখন আর রুপা। দুই ধর্ম, দুই জাত। কিন্তু একটা ছাদের নিচে।
গ্রামের বুড়োরা এখন বলে, "ওই রুপা মেয়েটা। এক পা নাই, কিন্তু আমাদের চেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়,আমাদের জাতধর্ম ভুলিয়ে দিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।" রক্ত ছিল। বঞ্চনা ছিল।
ছিল প্রতিবাদও।
রুপা প্রমাণ করেছে —
শরীরের একটা অংশ চলে গেলেও, স্বপ্নের দুইটা ডানা থাকে।
আর সেই ডানা দিয়ে উড়লে, রেললাইনের উপরে উঠে, আকাশে উড়া যায়, স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা যায়।

ধন্যবাদ ও শুভকামনা
ReplyDelete