১
শিমুলতলীর দুই চাতক
সবুজে ঘেরা শান্ত গাঁ শিমুলতলী। তার কোল ঘেঁষেই ক্লান্তিহীন বয়ে চলে কালিনন্দী নদী। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই যখন বাতাসে আযানের সুর ভেসে আসে, তখন আলতো কুয়াশা গায়ে মেখে জেলেরা নৌকা নামায় শান্ত নদীর জলে। নদীর মতনই সহজ-সরল এ গাঁয়ের মানুষেরা।
ভোরের সেই স্নিগ্ধ আযানের ধ্বনি মন ব্যাকুল করে তোলে মুন্তাজ উদ্দিনের। আলগোছে বিছানা ছেড়ে চৌকি থেকে নামেন তিনি। নাতিপুতিদের ডেকে নিয়ে ফজরের নামাযের উদ্দেশ্যে রওনা হন মসজিদের পানে।
এই নিভৃত পরিবারেই নানা-নানি আর মামাদের অপরিসীম স্নেহে বেড়ে উঠছিল দুটি কিশোর-কিশোরী—মাহবুব ও ফরজানা। মাহবুব বড় মেয়ের ঘরের বড় নাতি, এখানে থেকে কেবলই লেখাপড়া করে। আর ফরজানা মেঝ মেয়ের ঘরের বড় নাতনি; তবে তার এখানে থাকার কারণটা নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাস। ফরজানা যখন মায়ের গর্ভে, তখনই তার পিতা-মাতার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে সংসারটি ভেঙে যায়। সময়ের তাগিদে দুজনেই পরে আলাদা সংসার পাতেন। সেই থেকে অবোধ ফরজানার কাছে এই নানা বাড়িই হয়ে ওঠে একমাত্র আপন ঠিকানা।
মাহবুব যখন কলেজের বারান্দায় পা রাখল, ফরজানা তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সবে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। দুজনের বয়সের ব্যবধান প্রায় বছর দশেকের। শৈশব আর কৈশোরের সন্ধিক্ষণে একই আঙিনায় বাড়তে থাকা এই দুজনকে প্রবীণ নানা-নানির চোখে মনে হতো যেন এক চমৎকার জুটি।
একদিন বারান্দায় বসে মুন্তাজ উদ্দিন তাঁর বিবি জামিলা খাতুনকে ফিসফিস করে বললেন, "এই শুনছ? দেখ, ওরা দুজন একত্রে বসে কেমন গল্প করছে! কী সুন্দর লাগছে না? মনে মনে একটা জল্পনা করছি—ওদের দুজনকে একে অপরের সাথে বিয়ে দিলে কেমন হয়?"
জামিলা বিবি মুখে কিছু না বললেও তাঁর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। বিবির এই নীরব সম্মতি দেখে মুন্তাজ উদ্দিন তো খুশিতে আটখানা!
২
বিরহের সুর ও শহরের ডাক
কলেজের পাঠ শেষ করে মাহবুব ভর্তি হলো শহরের এক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে। এবার চেনা গ্রাম, চেনা নদী ছেড়ে তাকে পাড়ি জমাতে হবে দূর শহরে। মনটা তার ভীষণ বিষণ্ণ। কারণটা অব্যক্ত হলেও সত্য—তার সমস্ত হৃদয় জুড়ে জড়িয়ে আছে ফরজানা। তাকে না দেখে একটা দিনও যেন কাটতে চায় না মাহবুবের। সামনের এই দীর্ঘ দিনগুলো সে শহরে একা একা কীভাবে কাটাবে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে কোনো উত্তর পায় না।
যাওয়ার দিন সকালবেলা মালসামানা গুছিয়ে মাহবুব বাড়ির উঠোনের কামরাঙা গাছের তলায় একটা চেয়ারে এসে বসল। তার মন বলছিল, ওপাশে ফরজানাও নিশ্চয়ই একই রকম বিরহ-ব্যথা অনুভব করছে। যাওয়ার আগে অন্তত কিছু একটা বলতে সে নিশ্চয়ই তার কাছে আসবে।
কিছুক্ষণ পর ফরজানার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "ভাই, তুমি এখানে বসে আছ? নানি ওদিকে ভাত বেড়ে বসে আছেন। তাড়াতাড়ি চলো, মেঝ মামা খাওয়া শেষ করে বসে আছেন। বেলা অনেক হলো, উনি কিন্তু রাগ করছেন।"
একশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল ফরজানা। অথচ যে একটি মধুর কথার জন্য মাহবুব অধীর আগ্রহে চাতকের মতো বসে ছিল, সেই কথাটি ফরজানা ভুলেও উচ্চারণ করল না। অভিমানে ও ক্ষোভে মাহবুবের বুকটা রি রি করে উঠল। ওদিকে মেঝ মামা সাথে যাবেন শহরে থাকার জায়গা ঠিক করে দিতে, তাই আর দেরি করার সুযোগ নেই।
খাওয়ার পর্ব শেষ করে মাহবুব মেঝ মামার সাথে নৌকায় গিয়ে বসল। বিদায় জানাতে বাড়ির সবাই এসেছে কালিনন্দীর ঘাটে। মাহবুব চেয়ে দেখল, ফরজানার মুখে এক চিলতে উজ্জ্বল হাসি; বিদায়ের কোনো বিষণ্ণতার ছায়া নেই তার চোখে। মাঝি লগি ঠেলতেই নৌকা ছেড়ে দিল। যত দূর চোখ যায়, দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত মাহবুব অপলক চোখে চেয়ে রইল ফরজানার দিকে। এক সময় বাঁকের মুখে সব ঝাপসা হয়ে গেল।
৩
ইটের শহরে নতুন নোঙর
নৌকা থেকে নেমে প্রায় দুই মাইল কাঁচা রাস্তা হেঁটে যেতে হবে। ভারী ব্যাগটা মাহবুবকেই বইতে হচ্ছে, কারণ মামাকে তো আর ব্যাগ বহন করতে বলা যায় না। হাঁটতে হাঁটতে অসংখ্য চিন্তা এসে ভিড় জমালো মাহবুবের মাথায়।
ভাগ্নের নীরবতা দেখে মামা কিছুটা কড়া সুরে বললেন, "কী রে ছোঁড়া! চুপটি করে আছিস যে? নতুন জায়গায় যাচ্ছিস, ফুর্তি লাগার কথা, তা না করে মুখ কালো করে আছিস কেন? আগে তো হাতে ১০০ টাকা পেলেই সিনেমা দেখার জন্য শহরে ছুটে যেতিস। চিড়িয়াখানা শতবার দেখেও তোর সাধ মিটত না। আর এখন শহরে পড়তে যাচ্ছিস, তবু মন ভালো নেই কেন?"
মাহবুব আমতা আমতা করে বলল, "মামা, আমি কিন্তু মাসে অন্তত একবার হলেও গাঁয়ে চলে আসব।"
মামা হেসে বললেন, "হ্যাঁ রে পাগলা, তা তো আসবিই। মাসে দু-তিন দিন বাড়িতে এসে থাকবি, কোনো সমস্যা নেই।"
ঘাট পার হতেই কুলিরা এসে ভিড় করল। কালো কুচকুচে পাহাড়ের মতো এক বলিষ্ঠ কুলি এসে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, "চলুন সাহেব, যা ইচ্ছে দিবেন।" মামা আর দরদাম করলেন না। মাহবুবের মনটা এবার একটু হালকা হলো। এরপর বাস, তারপর লঞ্চ পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছাল জনবহুল, ব্যস্ত ইটের শহর ঢাকায়। মামা সাথে থাকায় চেনা শহরে পৌঁছাতে কোনো বেগ পেতে হলো না। প্রবাদেই তো আছে—"মামা আগে যেখানে, আপদ নাই সেখানে।"
মিরপুর জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার; একটি নামী বিদেশী প্রতিষ্ঠান। ড্রাইভিং থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বিষয়ে এখানে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মামা মাহবুবকে সেখানে ভর্তি করিয়ে এবং একটি সুন্দর মেসে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে গ্রামে ফিরে গেলেন।
শহরের এই নতুন জীবন মাহবুবের কাছে বড্ড খাপছাড়া ঠেকে। এতদিন গ্রামে স্বজনদের মাঝে যে আনন্দময় দিন কেটেছে, তার সাথে এর কোনো মিল নেই। মেসের দশ জেলার দশজন ছেলে, কারো সাথে কারো চেনা-পরিচয় নেই। ক্লাস শেষ করেই মাহবুব তাই ঘরের কোণে চুপচাপ বসে থাকে।
৪
রোজনামচা ও বন্ধুত্বের হাতছানি
"কী রে হাবা! চুপ কইরা কী ভাবতাছস? চল, রমনা পার্কে যাইগা, একটু ঘুইরা আসি। মনডা ঠিক অইয়া যাইব। গ্রাম থেইক্যা আইছস তো, এইন্যা লাগ্যা প্রথম প্রথম একটু খারাপ লাগতাছে।"
কথাগুলো বলল পারভেজ। সে মিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা। মাহবুবের সরলতা দেখে সে নিজেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। পারভেজের জোরাজুরিতে মাহবুব না করতে পারল না। প্রকৃত বন্ধুই তো ভাইয়ের মতো হয়, যে হৃদয়ে স্থান করে নেয়। বন্ধুর মন খারাপ দূর করতে পারভেজ তাকে প্রায় জোর করেই নিয়ে গেল রমনা পার্কে।
পার্কের ভেতরে ঢুকে মাহবুব তো রীতিমতো আনমনা হয়ে গেল। এ যেন এক আধুনিক বৃন্দাবন! পুরাণে শুনেছিল বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ ষোলো শ গোপিনীর সাথে প্রেমের খেলা খেলতেন, আর এখানে দেখছে প্রতিটি গাছের তলায় জোড়ায় জোড়ায় মানুষ প্রেমের মায়াজাল বুনছে।
মাহবুব ফিসফিস করে বলল, "পারভেজ, তুই আমাকে এ কোন প্রেমের স্বর্গে নিয়ে এলি রে?"
পারভেজ হেসে পিঠ চাপড়ে বলল, "আবে হালায়, জীবনডারে বুঝবার চেষ্টা কর। আচ্ছা দোস্ত, তুই কি কোনো মাইয়ার লগে প্রেম করছস? আমি তো কত মাইয়ার লগে লাইন লাগাইলাম, এক শালীও আমারে ভালোবাসল না!"
মাহবুব একটু গম্ভীর হয়ে বলল, "ভালোবাসা কি ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়? ভাগ্যে থাকলে দেখবি একদিন না একদিন কেউ তোকে ভালোবেসে তোর মন-হৃদয় ভরিয়ে দেবে।"
পারভেজের কাছে ফরজানার নামটা গোপন রাখলেও, পার্কের সেই মনোরম পরিবেশ আর বন্ধুর কথায় মাহবুবের মনে তীব্রভাবে ফরজানার মুখটি ভেসে উঠল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। সুন্দর মনের প্রেম পূজারীরা সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ঘরের দিকে পা বাড়াল, আর যাদের মন সন্ধ্যার অন্ধকারের মতোই কালো, তারা রয়ে গেল পার্কের কোণে। মাহবুব ও পারভেজ রুমে ফিরে নিজ নিজ টেবিলে বসল।
ছাত্র হিসেবে মাহবুব বরাবরই মেধাবী। এসএসসিতে তিনটি লেটারসহ প্রথম বিভাগ এবং এইচএসসিতেও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিল সে। এখানেও ভালো ফলাফলের আশা রাখে। শুধু পড়াশোনাই নয়, ভলিবল খেলাতেও সে মেসের সবার মন কেড়ে নিয়েছে।
তবে মাহবুবের স্বভাবটা কিছুটা বদমেজাজী। বাড়িতেও কেউ তার সাথে খুব একটা তর্কে জড়াত না। ফলে মেসের জীবনে পারভেজের সাথে একদিন সামান্য কারণে তার মনকষাকষি হয়ে গেল। প্রায় এক সপ্তাহ দুজনে কোনো কথা বলল না। কিন্তু মনের ভেতর মাহবুব গ্রামে যাওয়ার এক পরিকল্পনা আঁটছিল এবং ঠিক করেছিল পারভেজকেও সাথে নেবে। তাই সব মান-অভিমান ভুলে একদিন সন্ধ্যায় সে সোজা পারভেজেদের বাসায় গিয়ে হাজির হলো।
৫
প্রদীপের আলোয় ঘরের টান
টেবিলে মৃদু ডিমলাইট জ্বলছে। সামনে বই খোলা থাকলেও পারভেজের মন পড়ে ছিল মাহবুবের চিন্তায়। হঠাৎ দরজায় মাহবুবকে দেখে সে চমকে উঠল।
মাহবুব ঘরের ভেতর ঢুকে বলল, "আমি আগামীকাল দেশে যাচ্ছি, তোকে বলতে এলাম। তুই না আমার সাথে যেতে চেয়েছিলি? তা, যাবি নাকি?"
পারভেজ মজা করে বলল, "দেশে যাবি মানে? তোর দেশ কি পাকিস্তান, নাকি আমাদের এই ভারত?"
মাহবুব একটু বিরক্ত হয়ে বলল, "আরে, দেশ মানে আমাদের গ্রামের বাড়ি! তুই এত খুঁত ধরিস কেন বলতো? মেজাজ খারাপ হয়। ওসব কথা রাখ, বল—আমাদের বাড়ি গেলে কী কী ফল গাছ থেকে পেড়ে খাবি? আর হ্যাঁ, নানার কাছ থেকে কিন্তু তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার গল্প শুনতে হবে, বলে দিলাম।"
আনন্দে আত্মহারা হয়ে পারভেজ বলল, "আলবাত যাব! কাল সকালেই রওনা হব। তুই সকাল ৮টার মধ্যে রেডি থাকিস।"
মাহবুব চলে যেতে চাইল, কিন্তু পারভেজ তাকে আটকাল, "কী রে, কিছু না খেয়েই চললি? বোস, বাবা-মা এক আত্মীয়ের বাসায় গেছেন, এখনই ফিরবেন। আমি চা নিয়ে আসছি।"
"না রে ভাই, চায়ের দরকার নেই। এমনিতেই রঙিন হাওয়ার অবিনাশ বাসে রাতে ঘুম হবে না, তার ওপর আবার চা!"—বলল মাহবুব।
পারভেজ চোখ টিপে বলল, "কিছু হবে না রে। আজ না হয় জেগেই রাত কাটালি, অন্তত চোখ বন্ধ করলে ফরজানার মুখের প্রতিচ্ছবি তো দেখতে পাবি!"
বন্ধুর কথায় মাহবুবের ঠোঁটে একটা চোর-হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, "তাহলে আজ আসি, কাল সকালে একদম তৈরি থাকিস।" এই বলে সে হোস্টেলের দিকে রওনা দিল।
৬
কুটিম পাখির ডাক ও মেহমান
পরদিন সকালে শিমুলতলী গ্রামের মেঝ মামার বাড়ির নিম গাছের ডালে বসে একটা কুটুম পাখি আপন সুরে ডেকে চলেছে।
তাই দেখে ফরজানা আনন্দে আত্মহারা হয়ে মামীকে ডেকে বলল, "মামী! এই মামী, দেখেছ? নিম গাছে কুটুম পাখি ডাকছে। আজকে নিশ্চয়ই বাড়িতে কোনো কুটুম (মেহমান) আসবে!"
বড় মামী হেসে বললেন, "পাগলী মেয়ের কথা শোন! এসব সেকালের সনাতন কথা, এখন আর এসব ফলে না।"
মামীর কথা শেষ হতে না হতেই উঠোনে এসে হাজির হলো মাহবুব আর পারভেজ।
মাহবুব হাসিমুখে বলল, "কেমন আছেন মামী?" তারপর ফরজানার দিকে তাকিয়ে বলল, "কী রে ফরজানা, কেমন আছিস?"
ফরজানা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, "ভালো। ভাইয়া, উনাকে তো চিনলাম না?"
মাহবুব বলল, "কী করে চিনবি, আগে তো কখনো দেখিসনি। ও পারভেজ, আমার বন্ধু। আমরা একই সাথে পড়াশোনা করি।"
মামী ব্যস্ত হয়ে বললেন, "আমার বাছাটা রোদে শুকিয়ে গেছে! তোরা গল্পগুজব পরে করিস, আগে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে বোস। ফরজানা মা, কাউছকে দিয়ে গাছ থেকে কয়েকটা ডাব পেড়ে ওদের এনে দে তো।"
ফরজানা ডাব আনতে চলে গেল। পারভেজ চারদিকের সবুজ পরিবেশ দেখে মুগ্ধ। সে ফিসফিস করে মাহবুবকে বলল, "মেয়েটি তো খুব মিষ্টি রে মাহবুব! এই শালা, মারব একটা, চোখ বড় করিস না! এই-ই কি তবে তোর মনের মানুষ? এই জন্যই তাহলে বাড়ি আসার এত তাড়া, না?"
ইতিমধ্যে ছোট ভাই কাউছ জগ ভর্তি পানি নিয়ে এল হাত-মুখ ধোয়ার জন্য। এরপর টাটকা ডাবের পানি খেয়ে পারভেজ তো আহ্লাদে আটখানা। ঢাকায় পয়সা দিয়ে কিনে খাওয়া ডাবেও সে কখনো এমন স্বাদ পায়নি। মনে মনে ভাবল, একেই বলে গ্রাম—টাটকা শাকসবজি আর তাজা মাছের ছোঁয়ায় যেখানে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
৭
মেঘের ঘনঘটা ও অন্তিম ইচ্ছা
দেখতে দেখতে রাত নেমে এল। মাহবুব মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল, রাতে নানার কাছ থেকে পারভেজকে চমৎকার সব রূপকথা ও ইতিহাসের গল্প শোনাবে। কিন্তু নানা মুন্তাজ উদ্দিন সেই যে সকালে বাজারে গেছেন, এখনও ফেরার নাম নেই। জামিলা বিবি অস্থির হয়ে উঠোনে পায়চারি করছেন, বৃদ্ধ মানুষটা তো কখনো এত দেরি করেন না!
তিনি বললেন, "এই মাহবুব, তুই একটু সাইকেলটা নিয়ে বাজারে যা তো, তোর নানাকে দেখে আয়।"
জামিলা বিবির কথা শেষ হতে না হতেই দেখা গেল, মুন্তাজ উদ্দিন লাঠিতে ভর দিয়ে কোনোমতে উঠোনে এসে ধপাস করে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা ছিটকে গেল, ফরজানা তা কুড়িয়ে নিল। বৃদ্ধ মুন্তাজ উদ্দিন হাঁপাতে হাঁপাতে অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, "সবাইকে ডাকো... আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে... আমি এখনই চলে যাব..."
জামিলা বিবি আর্তনাদ করে উঠলেন। নাজির, বছির, সাইদাসহ আশেপাশের সবাইকে চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িটা যেন এক অজানা অন্ধকারে ডুবে গেল। খবর পেয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছেলে-মেয়েরা যে যেখানে ছিল, সবাই এসে হাজির হলো। কান্নার রোলে ভারী হয়ে উঠল শিমুলতলীর আকাশ।
মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে, মুন্তাজ উদ্দিন কোনোমতে চোখ মেলে ফরজানা ও মাহবুবকে কাছে ডাকলেন। সবার দিকে চেয়ে অত্যন্ত আকুলতায় তাঁর শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করে বললেন, "আমার শেষ ইচ্ছা... ফরজানার সাথে মাহবুবের বিয়ে দিয়ে তোমরা আমার আত্মাটাকে শান্তি দেবে..."
দুজনের হাত একসাথে নিজের বুকের ওপর জড়িয়ে ধরে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিরতরে চোখ বুজলেন বৃদ্ধ মুন্তাজ উদ্দিন।
৮
ভাঙা নীড় ও মনের অন্তরালে
মুন্তাজ উদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারের হাসি-খুশি নিমেষেই পণ্ড হয়ে গেল। আনন্দপুরী বাড়িটি পরিণত হলো এক শোকাতুর কাননে। বাড়ির এই থমথমে ও বিষাদময় পরিবেশে মাহবুবের মন আর টিকছিল না। পারভেজও যেন পাথর হয়ে গেছে। পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলে পারভেজ মাহবুবকে সাথে নিয়ে আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
এদিকে নানা মারা যাওয়ার পর ফরজানা এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্বে ও সংকটে পড়ে গেল। সে মনে মনে ভাবতে লাগল—নানা শেষ মুহূর্তে এ কী এক দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গেলেন! আমি কিছুতেই মাহবুব ভাইকে বিয়ে করতে পারব না, কখনো না। অমন খিটখিটে মেজাজের মানুষের সাথে আমি কীভাবে ঘর করব?
যে কোনো তরুণীই চায় তার জীবনসঙ্গী যেন তার মনের মতো, কোমল ও পছন্দের কেউ হোক। ফরজানা আগে থেকেই মাহবুবকে একটু এড়িয়ে চলত, আর এখন নানার অসিয়তের কারণে সবাই যখন বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করছে, তখন ফরজানা যেন মাহবুবের নামটুকুই আর সহ্য করতে পারছিল না।
ফরজানার মনের গভীরে যে এত ক্ষোভ আর কুটিলতা আবর্তিত হচ্ছে, তা দূর আকাশে থাকা মাহবুবের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। সে শহরের মেসে বসে মনের গভীরে তার কল্পিত রাজকন্যা 'রুনী'-কে নিয়ে সুখের প্রাসাদ বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে দিন কাটাচ্ছিল।
মুন্তাজ উদ্দিনের হঠাৎ প্রস্থানে পুরো সংসারটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। বড় ছেলে নাজির উদ্দিনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল—এত বড় যৌথ পরিবারটা এখন সে কীভাবে আগলে রাখবে?
৯
অবহেলা ও প্রবাসের ডাক
মানুষ প্রবাদেই বলে—দাঁত থাকতে মানুষ দাঁতের মর্ম বোঝে না, আর যখন বার্ধক্যে দাঁতগুলো খসে পড়ে, তখন আফসোসের সীমা থাকে না। নাজির উদ্দিনের অবস্থাও হলো তাই। বাবা বেঁচে থাকতে কখনো তাঁর কদর বোঝেনি, এখন পদে পদে উপলব্ধি করছে অভিভাবকের মূল্য। বাবা তো ছিলেন এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো, যিনি কাঠফাটা রোদে নিজের শরীর পুড়িয়ে সন্তানদের ছায়া দিতেন।
ইতিমধ্যে মেঝ ভাই বছির উদ্দিন নিজের অংশ বুঝে নিয়ে বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে গেল। সংসারে টানাপোড়েন শুরু হওয়ায় বড় ভাই নাজির এখন ছোট ভাই সাঈদকে খোঁটা দিয়ে কথা বলতে শুরু করল। পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে তাকে অবিলম্বে উপার্জনের পথ খুঁজতে বলল।
সাঈদ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, "তাহলে আমাকেও মেঝ ভাইয়ের মতো বিদেশে পাঠিয়ে দাও।"
নাজির উদ্দিন আর দেরি না করে কয়েক মাসের মধ্যে ধারদেনা করে সাঈদকে প্রবাসে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিল।
মামাদের মধ্যে এই সাঈদ মামাই ফরজানাকে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন। তার আশ্রয়ে ফরজানা কখনো বাবা-মার অভাব টের পায়নি। সাঈদ চলে যাওয়ার পর বাড়িটা যেন পুরোপুরি নিঝুম হয়ে গেল। এক কালবৈশাখী ঝড় এসে যেন সুখের নীড়টিকে ভেঙে খানখান করে দিয়ে গেল।
একদিন ফরজানাকে বারান্দায় একা বসে থাকতে দেখে মেঝ মামা বছির এসে জিজ্ঞেস করলেন, "মারে, মনটা বুঝি খুব খারাপ?"
মামার এই স্নেহের প্রশ্নে ফরজানা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বছির তাকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, "মামার ওপর রাগ করিস না মা। পড়াশোনায় মন দে। তোকে অনেক বড় হতে হবে। একজন ইঞ্জিনিয়ারের বউ হতে গেলে অন্তত বি.এ পাশ তো করতে হবে, নাকি?"
মামার এই সান্ত্বনায় ফরজানার মন আরও বিষণ্ণতায় ভরে উঠল। সে বুঝল, সবাই তাকে মাহবুবের ঘাড়েই চাপাতে চাইছে।
সে কোনো উত্তর না দিয়ে বলল, "মাগো, মাঠের গরুগুলো একটু নেড়ে দিয়ে আসি। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে।" এই বলে সে বিরবির করতে করতে বৃষ্টির মাঝেই উঠোনে নেমে গেল।
১০
ক্ষোভ ও মেলার আনন্দ
"উনাকে আমি কোনোদিন মনে স্থান দিতে পারব না! সে কখনো আমার আপন হতে পারে না। যদি বেশি জোরাজুরি করো, আমি একদিন সত্যি সত্যি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।"—নিজের মনেই ক্ষোভ উগরে দিল ফরজানা।
এমন সময় জামিলা বিবি পিছন থেকে এসে বললেন, "কী রে ফরজানা! বাড়ি ছেড়ে তুই কোথায় যাবি?"
ফরজানা রাগে ও অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে বলল, "জাহান্নামে!"
নানি নাতনির রাগ ভাঙাতে সুর নরম করে বললেন, "চল না বোন, আজ আগুনপুরের মেলা থেকে একটু ঘুরে আসি। তোর ছোট খালা তোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুব করে বলেছে।"
নানির মুখে মেলার কথা শুনে ফরজানার সব রাগ জল হয়ে গেল। সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল, "সত্যি বলছ নানি? কখন যাবে? চল, বিকেলেই রওনা হই।"
জামিলা বিবি চোখ রাঙিয়ে বললেন, "কী ব্যাপার, মেলা যাওয়ার এত খুশি কেন? তবে এবার কিন্তু তোকে যাত্রা দেখতে দেব না, আগেই বলে দিলাম।"
ফরজানা এখন আর সেই ছোট্ট খুকিটি নেই। ষোলো বছরের এক ডাগর ও সুন্দরী তরুণী সে। নানি ভাবলেন, এই বয়সের মেয়ের যাত্রা বা মেয়েদের নাচ দেখতে যাওয়া ঠিক নয়।
ফরজানা নানির গলা জড়িয়ে ধরে বলল, "আচ্ছা নানি, যাত্রা দেখতে হবে না, খালার সাথে শুধু মেলা ঘুরে চলে আসব। ঠিক আছে তো?"
বিকেল বেলা নানি-নাতনি মেলা অভিমুখে রওনা হলো। মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফরজানা বলল, "পূর্ব দিকে মেঘ করেছে নানি। সকালে রওনা দিলে চোখে রোদ লাগত, বিকেলে বের হওয়াটাই ভালো হয়েছে।
কী বলো?"
জামিলা বিবি বললেন, "তা ঠিক বলেছিস।"
ফরজানার চোখে-মুখে এখন উদীয়মান যৌবনের লাবণ্য। মেঠো পথে যাতায়াত করা গাঁয়ের যুবকেরা তার দিকে না তাকিয়ে পারছিল না।
ফরজানা একটু গর্ব ও কৌতুক মেশানো সুরে বলল, "নানি, তুমি কত ভালো! আচ্ছা, পথচলতি ছেলেগুলো হাঁ করে আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন বলো তো?"
জামিলা বিবি একটু রেগে বললেন, "তাকাবে না তো কী! এই জন্যই তোকে বোরকা পরে আসতে বলেছিলাম, তুই তো আমার কথা শুনলি না।"
ফরজানা মুখ ভেঁচকে বলল, "নানি! তুমি এই বয়সেই আমাকে বুড়ি বানাতে চাও? আমার যেমন খুশি আমি তেমন চলব। এরপর যদি কোনো ছেলে আমার দিকে ফেলফেল করে তাকায়, তবে ওগো চোখ আমি একেবারে তুলে ফেলব!"
"চোখ তুলবি পরে, আগে বাজারে চল। বাড়ির জন্য কিছু সওদা করতে হবে।" এই বলে জামিলা বিবি ফরজানার হাতে একটা একশত টাকার নোট গুঁজে দিলেন।
১১
আগুনপুর বাজারে লিটনের আগমন ও প্রথম দেখা
আগুনপুর বাজারটি ঠিক গ্রামীণ বাজারের মতো নয়, বেশ জনবহুল ও জমজমাট। বাজারের একপাশে উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়, আর দক্ষিণ দিকে রয়েছে এককালের বিখ্যাত 'প্রীতি সিনেমা হল'। হলের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে একটি সরু খাল।
মেলায় ঘোরার পর বাজারে সওদা করার সময় হঠাৎ এক মিষ্টি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, "এই নানি! আপনি কখন এলেন?"
জামিলা বিবি তাকিয়ে দেখলেন এক চেনা যুবক। বললেন, "এই তো রে ভাই, আসলাম। তা তোরা কেমন আছিস? বাড়ির সবাই ভালো?"
ফরজানা একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে ছেলেটির দিকে তাকাল। ছেলেটির নাম লিটন। যেমন নম্র-ভদ্র, তেমনই মায়াবী তার চেহারা। ফরজানা এর আগে দূর থেকে দু-একবার তাকে দেখলেও, লিটন বড্ড লাজুক স্বভাবের হওয়ায় কখনো কথা বলার সুযোগ হয়নি।
হঠাৎ করেই লিটনের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ফরজানার চোখের ওপর। চার চোখ এক হলো। মুহূর্তের জন্য চারপাশের কোলাহল যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রায় মিনিট পাঁচেক তারা অপলক চোখে একে অপরের দিকে চেয়ে রইল। মনে হলো, সেই ক্ষণিক দৃষ্টিপাতেই দুজন দুজনের চোখের মাঝে এক ভালোবাসার স্বর্গীয় পৃথিবীর সন্ধান পেয়ে গেছে!
নানি দুজনের এই নীরব চাতক-চাহনি দেখে ধমকের সুরে বলে উঠলেন, "এ কী! কী হলো তোদের? একজন আর একজনের দিকে এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন? লিটন, খবরদার! ফরজানার দিকে একদম তাকাবি না। একটু আগেই ও আমাকে বলেছে, যে ছেলে ওর দিকে তাকাবে, তার নাকি চোখ দুটো ও তুলে ফেলবে! কী রে ফরজানা, সত্যি বলিসনি?"
নানির এই রসিকতায় ফরজানা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "ইস্ নানি! একদম ভালো হবে না কিন্তু!"
১২
হৃদয়ের আদান-প্রদান ও গোপন টান
সেই প্রথম দেখার পর লিটন ও ফরজানার মাঝে এক অদ্ভুত সম্পর্কের সূচনা হলো। ছোট খালার বাড়ির উসিলায় ফরজানার প্রায়ই আগুনপুর আসা হতো, আর সেই সুযোগে লিটনের সাথেও দেখা হতো নিয়মিত। খালার বাড়ি বেড়ানোর বাহানায় কেউ তাদের এই নীরব যোগাযোগকে সন্দেহের চোখে দেখল না।
ধীরে ধীরে দুজনের পরিচয় রূপ নিল গভীর প্রণয়ে। অন্য আট-দশটা ছেলের মতো লিটন উগ্র বা বাচাল নয়। তার কণ্ঠস্বর মৃদু, আচরণ অত্যন্ত মার্জিত ও মায়াবী। তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বললেই যে কারো মনে এক গভীর রেখাপাত তৈরি হয়। ফরজানাও লিটনের এই সরল, সুশ্রী হৃদয়ের কাছে নিজের সমস্ত আবেগ ও ভালোবাসা সঁপে দিল। কালিনন্দীর কূলে দুটি মন এক সুতোয় বাঁধা পড়ল।
১৩
মরীচিকা ও বিরহের সমাপ্তি
কিন্তু নিয়তি মানুষের ভাগ্য নিয়ে যে কত নিষ্ঠুর খেলা খেলতে ভালোবাসে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। প্রথম প্রেমের সেই ব্যাকুলতা, স্বপ্নের সেই বালির প্রাসাদ বাস্তবতার এক একটি ঢেউয়ে একসময় ভেঙে পড়তে শুরু করল। সামাজিক দেয়াল, পারিবারিক দায়বদ্ধতা আর তীব্র এক অলিখিত মর্মপীড়ার মধ্য দিয়ে ফরজানা ও লিটনের এই গভীর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এক আকস্মিক ও করুণ সমাপ্তির দিকে এগিয়ে গেল। তাদের পবিত্র প্রেমের মিলন আর সম্ভব হলো না। বুকভরা হাহাকার আর আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো এক বুক নীরব কষ্ট নিয়ে তারা একে অপরকে বিদায় জানাতে বাধ্য হলো।
এদিকে ঢাকা শহরের ইটের খাঁচায় বন্দী মাহবুবকেও পরিস্থিতির শিকার হয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। মনের মণিকোঠায় কল্পিত 'রুনী'-র প্রতিচ্ছবি বা অন্য কোনো স্বপ্ন লুকিয়ে রাখলেও, শেষ পর্যন্ত নানার অন্তিম অসিয়ত আর পরিবারের প্রবল চাপে তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে নিজের খালাতো বোনকে বিয়ে করতে হলো। নিজের ইচ্ছের আহূতি দিয়ে সে আবদ্ধ হলো এক নতুন বৈবাহিক সংসারে।
অন্য এক সম্পূর্ণ ভিন্ন স্রোতে ভেসে গেল ফরজানার জীবনও। লিটনের স্মৃতি বুকের গহীন প্রকোষ্ঠে পাথর চাপা দিয়ে, ভাগ্যের চাকা ঘুরে এক প্রবাস ফেরত সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেল। এক বুক নীরব কান্না আর অচেনা এক পরিবেশকে সঙ্গী করে ফরজানা তার জীবনের নতুন ও ধূসর এক অধ্যায় শুরু করল।
সময় তার নিজস্ব অমোঘ গতিতে বয়ে চলে। কালিনন্দীর জল অনেক দূর গড়িয়ে যায়, স্মৃতির ক্ষতে জমে ওঠে ধুলোবালির পুরু আস্তরণ। কিন্তু নিয়তির ভিন্ন ভিন্ন স্রোতে ভেসে গিয়েও একদিন সবার জীবনেই নতুন আলোর রেখা দেখা দেয়।
দূর প্রবাসে ফরজানার কোল আলো করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে সন্তান। আর ওদিকে, নিজের অনিচ্ছার সংসারে থেকেও মাহবুবের ঘর আলো করে আসে এক নতুন অতিথি। দুজনের জীবনেই সন্তান লাভের মধ্য দিয়ে এক অদ্ভুত মানসিক পূর্ণতা আসে। কালিনন্দীর কূলের সেই তরুণ-তরুণীর প্রথম প্রেমের দিনগুলো হয়তো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু আজ সন্তানের নিষ্পাপ হাসির মাঝে তারা খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার এক নতুন অর্থ ও বাস্তব পথ। প্রথম প্রেমের অপূর্ণতা আর বিরহের রোজনামচাটি এভাবেই জীবনের এক রূঢ় ও শ্বাশ্বত বাস্তবতার পটভূমিতে এসে মিলে গেল।
