আষাঢ় মাস এলেই গ্রামের আকাশ যেন বদলে যেত। সকাল থেকে কালো মেঘ জমে থাকত, দূরে কোথাও বজ্রের গর্জন শোনা যেত। একটু পরেই শুরু হতো ঝুম বৃষ্টি। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। টিনের চালের উপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনতে শুনতে মনে হতো প্রকৃতি যেন নিজেই গান গাইছে। চারপাশে পানি জমে যেত, পুকুর-ঘাট উপচে পড়ত, ধানের মাঠ তলিয়ে যেত, নদী-নালা ভরে উঠত। পুরো গ্রাম যেন পানির রাজ্যে পরিণত হতো। বর্ষা এলেই আমাদের শৈশব ফিরে আসত নতুন রূপে।
ছোটবেলায় বর্ষা ছিল আনন্দের আরেক নাম। তখন মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, কিন্তু আনন্দের কোনো অভাবও ছিল না। বর্ষা নামলেই গ্রামের সব বন্ধু একসাথে হয়ে যেতাম। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় হাঁটু পানি উঠত। সেই পানিতে ছপছপ করে হাঁটতাম, দৌড়াতাম, হাসতাম। কারো শরীরে কাদা লাগলে সবাই মিলে আরও কাদা ছুড়ে দিতাম। মা দূর থেকে চিৎকার করে বলতেন, “এই, আর কত ভিজবি?” কিন্তু সেই ডাক কে শুনত! বৃষ্টির পানির সাথে খেলাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় সুখ।
বর্ষা এলেই গ্রামের চারপাশে মাছের সমারোহ দেখা যেত। ছোট ছোট খাল, ডোবা, ধানের জমি—সব জায়গায় দেশি মাছ ভেসে উঠত। টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, পুঁটি, খলসে—কত রকম মাছ! আমরা সবাই মাছ ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে যেতাম। কেউ বরশি নিয়ে বসত, কেউ জাল নিয়ে নামত পানিতে, আবার কেউ খ্যাপলা জাল নিয়ে ছোটাছুটি করত। সন্ধ্যা নামলেই গাড়িটার বা হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে মাছ ধরতে বের হতাম। পানির উপর আলো পড়লে মাছগুলো চকচক করত। সেই দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।
রাতের মাছ ধরার আনন্দ ছিল একেবারে আলাদা। কাদা মাখা পথ পেরিয়ে, হাঁটু পানি ভেঙে আমরা দূরের মাঠে চলে যেতাম। কোথাও কোথাও কোমর পানি থাকত। তবুও ভয় লাগত না। হাতে হ্যাজাক লাইট, কারো হাতে জাল, কারো হাতে বালতি। সবাই মিলে যেন এক উৎসব। একটা বড় মাছ ধরা পড়লেই সবাই চিৎকার করে উঠতাম আনন্দে। বাড়ি ফিরে মাছ দেখিয়ে গর্ব করতাম। মা হয়তো বকতেন, “এত রাতে পানিতে থাকিস কেন?” কিন্তু সেই বকুনির মাঝেও ছিল ভালোবাসা।
বর্ষা মানেই ছিল গোসলের উৎসব। সকাল, দুপুর, বিকাল—কতবার যে গোসল করতাম তার হিসাব নেই। পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে পড়া, গাছের ডাল থেকে পানিতে লাফ দেওয়া, একে অপরকে পানিতে ডুবিয়ে হাসাহাসি করা—এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বড় বড় পুকুরের পাশে গাছ ছিল আমাদের খেলার জায়গা। কে কত উঁচু থেকে লাফ দিতে পারে, সেটা নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। ভয়ে মায়েরা অনেক সময় পুকুরপাড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিন্তু আমাদের দুষ্টুমি থামত না।
বর্ষার সময় ফুটবল খেলাও ছিল অন্যরকম মজা। গ্রামের কোনো খালি মাঠে একটু পানি জমলেই আমরা ফুটবল নিয়ে নেমে যেতাম। কাদা মাখা মাঠে পড়ে যাওয়া, পিছলে যাওয়া, আবার উঠে দৌড়ানো—এসব যেন আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিত। খেলা শেষে সবাইকে দেখে মনে হতো কাদার মানুষ। কিন্তু সেই হাসিগুলো ছিল একদম নির্মল।
আমাদের গ্রামের ছেলেদের আরেকটি বড় আনন্দ ছিল কলাগাছের ভেলা বানানো। বর্ষার পানিতে কলাগাছ কেটে দড়ি দিয়ে বেঁধে ছোট্ট ভেলা বানাতাম। তারপর সেই ভেলায় চড়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতাম। কারো ভেলা উল্টে গেলে সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতাম। কখনো ছোট টিনের নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসাতাম। ছোট ছোট সেই নৌকাগুলো বৃষ্টির পানিতে ভেসে যেত দূরে। মনে হতো যেন আমাদের স্বপ্নগুলোও সেই নৌকার সাথে ভেসে চলেছে।
বর্ষা এলেই শাপলা তোলার ধুম পড়ে যেত। বিলের মধ্যে সাদা আর লাল শাপলা ফুটে থাকত। আমরা দল বেঁধে পানিতে নেমে শাপলা তুলতাম। কেউ মাথায় শাপলার মালা পরত, কেউ হাতে নিয়ে খেলত। গ্রামের মেয়েরাও শাপলা নিয়ে কত খেলাধুলা করত। শাপলার সেই সৌন্দর্য আজও মনে দাগ কেটে আছে।
বর্ষা শুধু আনন্দই নিয়ে আসত না, গ্রামের মানুষের জীবিকার সাথেও জড়িয়ে ছিল। একদল মানুষ শামুক কুড়াতে ব্যস্ত থাকত। বড় বড় বস্তায় শামুক ভরে বিক্রি করত। কেউ পাট ধোয়ার কাজে নামত। কৃষকরা সারাদিন পানিতে দাঁড়িয়ে পাট ধুতেন। তাদের কষ্টের মাঝেও ছিল এক ধরনের শান্তি। কারণ এই বর্ষাই তাদের জীবনের আশা।
বর্ষার দিনে গ্রামের দৃশ্য ছিল অপূর্ব। দূরে সবুজ ধানের ক্ষেত, তার উপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, মাঝেমধ্যে কুয়াশার মতো সাদা পর্দা। নদীর পানি ফুলে উঠত। নৌকায় করে মানুষ এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেত। নৌকার বৈঠার শব্দ শুনলে মনটা কেমন শান্ত হয়ে যেত। সন্ধ্যা হলে দূরে কোথাও হ্যাজাক লাইটের আলো জ্বলত। সেই আলো দেখে মনে হতো পুরো গ্রাম যেন এক রহস্যময় সৌন্দর্যে ভরে গেছে।
তখনকার দিনে জীবন ছিল সহজ, কিন্তু আনন্দ ছিল গভীর। এখনকার মতো এত ব্যস্ততা ছিল না। সবাই একসাথে সময় কাটাত। বর্ষা এলেই বন্ধুরা একত্র হতো। কেউ ডাকলেই সবাই ছুটে আসত। আজ সেই বন্ধুরা অনেকেই দূরে চলে গেছে। কেউ শহরে, কেউ প্রবাসে। কিন্তু বর্ষা এলেই তাদের কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয়, “বন্ধুরা তোরা কই?”
এখনও যখন বৃষ্টি নামে, টিনের চালের উপর শব্দ হয়, তখন ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে কাদা মাখা পথ, মাছ ধরার নেশা, ভেলার উপর ঘোরাঘুরি, পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, আর মা-বাবার বকুনি। সেই দিনগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ের ভেতর বেঁচে আছে।
শৈশবের বর্ষা ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। সেখানে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, ছিল না কোনো স্বার্থ। ছিল শুধু আনন্দ, বন্ধুত্ব আর প্রকৃতির সাথে মিশে থাকার এক অপূর্ব অনুভূতি। বর্ষা আমাদের শুধু ভিজিয়ে দিত না, আমাদের মনকেও ভরে দিত ভালোবাসা আর সুখে।
আজ আমরা বড় হয়ে গেছি। জীবনের ব্যস্ততা আমাদের ঘিরে রেখেছে। তবুও আষাঢ়ের মেঘ দেখলেই মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। মনে হয় আবার যদি সেই ছোটবেলায় ফিরে যেতে পারতাম! আবার যদি বন্ধুদের সাথে কাদা মাখা মাঠে ফুটবল খেলতে পারতাম, আবার যদি রাতভর মাছ ধরতে যেতে পারতাম, আবার যদি কলাগাছের ভেলায় চড়ে গ্রামের পানিতে ঘুরে বেড়াতে পারতাম!
বর্ষা আজও আসে, বৃষ্টি আজও নামে, নদী আজও ভরে যায়। কিন্তু সেই শৈশব আর ফিরে আসে না। শুধু স্মৃতিগুলো মনের ভেতর বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে। সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, মনে করিয়ে দেয়—একটা সময় ছিল, যখন ছোট ছোট আনন্দেই জীবন ভরে উঠত।
