পল্লী-বর্ষা ।। আসাদ আহমেদ

 



অফিস থেকে ফেরার পর শফিকের চেহারায় কেমন জানি এক মলিনতার ছাপ লক্ষ্য করল স্বপ্না। রাতে খাওয়ার সময় স্বপ্না বলল, কি হয়েছে তোমার? ওমন দেখাচ্ছে কেন.? অফিস থেকে ফেরার পর রোজ কত হাসি খুশি থাকো আজ কেমন মন মরা লাগছে। 
শফিক খাওয়া থামিয়ে বলল, বাড়ি থেকে মা কল দিছিলো, বাবার শরীলটা নাকি ভালো না। বাড়িতে যেতে বলছে। আমাদের নাকি দেখতে চায়। 
— ওওহ। এই ব্যপার। তাহলে ছুটি কাটাও। চলো।
আরমান তখনও কিছু জানেনা এই ব্যাপারে। টিভি ছেড়ে কার্টুন দেখায় মগ্ন সে । পড়া খাওয়া শেষ করে ১০:০০ টার পর টিভি দেখে ৩০ মিনিট এরপর ঘুম। 
স্বপ্না খাওয়া শেষ করে সোফায় আরমানের পাশে বসল। মুখটা কানের কাছে নিয়ে বলল, আরমান। আমরা খুব শীঘ্রই তোমার দাদাবাড়িতে যাচ্ছি। তোমার দাদা ভাই অসুস্থ খুব। রিমোট হাতে টিভি থেকে মনোযোগ সরিয়ে
— কি বলো!  আমরা কবে যাচ্ছি,?
— এইতো কাল পরশুর মধ্যেই হয়তো। যাও এখন গিয়ে ঘুমাও।
আরমান তৎক্ষনাৎ সোফা থেকে উঠে রুমে চলে গেলো।
আরমান শহরের ছেলে। জন্ম থেকে বড় হওয়া তার শহরেই। উঁচু উঁচু দালান, ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির হর্ণ, আর মোবাইল-টিভির জগতই ছিল তার পরিচিত পরিবেশ। স্কুল থেকে ফিরে সে কখনো মোবাইলে গেম খেলত, কখনো কার্টুন দেখত, আবার কখনো জানালার পাশে বসে দূরের আকাশ দেখত। চেনা দালানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকত। প্রকৃতির সঙ্গে তার পরিচয় খুবই কম।
পরের দিন দুপুরে রেডি হয়ে তারা গ্রামের দিকে রওয়ানা দিলো। বাস যখন শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে এগোতে লাগল, তখন জানালার বাইরে বদলে যেতে লাগল দৃশ্যপট। কংক্রিটের দালানের জায়গায় দেখা দিল বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, গাছপালা আর আঁকাবাঁকা কাঁচা পথ। এসব দেখে আরমানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
গ্রামে পৌঁছানোর সময় আকাশে কালো মেঘে ছেড়ে গেছে । যেন এখনই নামবে বৃষ্টি। আর সন্ধ্যাও হয়ে এসেছে। তাই অন্ধকার বেশি লাগছে। গাড়ি থেকে নেমে মিনিট পাঁচেক রাস্তা হেঁটে যাওয়া লাগে। রাস্তা তুলনামূলক পিচ্ছিল ও সরু হওয়ায় গাড়ি যেতে চায়না। মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছে গ্রামের মাইকে। আযানের ধ্বনিতে মাতোয়ারা গ্রাম। ঘন গাছগাছালির মাঝে ছায়াঘন অন্ধকার জমেছে। মাথার উপর দিয়ে সাঁই সাঁই শব্দে বাদুড় উড়ে ফলের গাছে পড়ছে ৷ রাতবক কক্...কক্ ডেকে উড়ে যাচ্ছে। একটা রাতচরা পাখি দূরে কোথাও সাঁঝের অন্ধকারে বসে গম্ভীর সুরে ডেকে উঠছে।  টুপপ্.. টুপপ্..
আরমানের কাছে এ যেন এক ভিন্ন জগৎ। নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন পরিচয়। স্বপ্না এক হাতে শক্ত করে আরমানের হাত ধরে আছে যেন পিচ্ছিল রাস্তায় হোঁচট না খায়। একটু দ্রুত আর সাবধানে পা চালাচ্ছে তারা। উঠোনে কাঁদা হয়ে গেছে। কিন্তু ঘরের সামনে পর্যন্ত পাকা করা তাই কাঁদা মাড়াতে হয়নি। ঘরে ওঠার কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। ফ্রেশ হয়ে দাদার দেখা করে আরমান খুব খুশি হলো। অসুস্থ হলেও দাদা তাকে দেখে হাসিমুখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এ যেন এক স্বর্গীয় আনন্দ। 
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই আরমান মেঘের গুরুগুরু ডাক শুনতে পেলো। জানালা খুলে সে প্রথমবারের মতো গ্রামের বর্ষাকাল দেখল। তাকিয়ে দেখে চারদিকে সবুজের সমারোহ। দূরে ধানের বীজ বাতাসে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। পাশে বাঁশঝাড়, আর গাছের ডালে নানা পাখির কিচির-মিচির শব্দ।
মুষলধারে বৃষ্টির পর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়ির সামনে কদমগাছে ফুটেছে গোল গোল সাদা-হলুদ কদমফুল। তাদের মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। শীতল বাতাস এসে আরমানের মন জুড়িয়ে দিল।
বিকেলে গ্রামের কয়েকজন ছেলের সঙ্গে তার পরিচয় হলো। রনি, সজীব, মিলন আর রাকিব। তারা আরমানকে নিয়ে গেল গ্রামের পথ ঘুরে দেখতে। কাদা মাখা সরু পথ, পুকুরের ঘাট, তালগাছের সারি—সবকিছুই তার কাছে নতুন লাগছিল। কেননা, গ্রামের বর্ষাকালের সাথে সে পূর্ব পরিচিত নয়।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো। শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
—"চলো, বৃষ্টিতে ভিজি!"
আরমান প্রথমে একটু ইতস্ততবোধ করলেও পরে কৌতুহলে সে বৃষ্টিতে ভিজতে সম্পূর্ন রাজি হয়ে গেল।
শহরে থাকলে বৃষ্টিতে ভেজার কথা ভাবাও যেত না। কিন্তু এখানে কেউ বাঁধা দিল না। আরমানও ছুটে গেল বন্ধুদের সঙ্গে।
বৃষ্টির পানিতে তারা দৌড়াতে লাগল, কাদায় লাফালাফি করল। কেউ বৃষ্টির পানিতে ফুটবল খেলল। হাসি আর আনন্দে মুখর হয়ে উঠল চারপাশ।
বাড়িতে আসার পর শফিক কাঁদামাখা পোশাকে দেখে একটু রাগের স্বরে বলল, তুমি কাদা মেখেছো কেন,? ভিজেছো কেন?
সালেহা বেগম বলল, আহা বাবা! তুই মোর দাদাভাই রে ধমকাচ্ছিস ক্যানো? তোর ও বয়সে তুই যা করতি মনে নেই।
শফিক চুপ হয়ে গেলো। 
স্বপ্না ঘরে থেকে এসে বলে, ও মা এ কে! কাদার ভূত এলো কোত্থেকে! এ ভূত এদিকে আসো। গোসল করিয়ে ভূত ছাড়াই।
গোসল করিয়ে শুকনা পোশাক পরিয়ে দিলো স্বপ্না। 
আরমান উৎফুল্লের সুরে বলল, আম্মু জানো, আজ অনেক মজা হয়েছে। জীবনে এইরকম মজা আর কখনো হয়নি।
তাই নাকি?  বলে একটু মুচকি হাসল স্বপ্না।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে,সঙ্গে পুকুর, ফসলি মাঠ, ডোবা থেকে ব্যাঙের ডাক জোরালো হয়ে আসতে লাগল। "ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর" শব্দে যেন এক অদ্ভুত সুর সৃষ্টি হয়েছে। কোলা ব্যাঙ এই সময় পানিতে বাচ্চা ছাড়ে। বড় আনন্দের সময় ওদের এইটা। জোনাকিরা ঝাড়বাতির মতো আলো জ্বেলে উড়ছে। আকাশে মেঘের ফাঁকে দেখা যাচ্ছে চাঁদের ম্লান আলো।
রাতে খাওয়ার পর দাদা সবাইকে নিয়ে গল্প বলতে বসলেন। তিনি শোনালেন নিজের শৈশবের কথা, বর্ষার দিনের নানা মজার ঘটনা, গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প। আরমান মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল।
দিন যেতে লাগল। প্রতিদিনই নতুন কিছু আবিষ্কার করছিল সে। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে মাছ ধরতে যেত, হালচাষ দেখত। কখনো কৃষকদের ধান রোপণ দেখতে দাঁড়িয়ে থাকত, আবার কখনো বৃষ্টির পর রঙধনু দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠত।
একদিন বিকেলে বাহিরে চেয়ার দিয়ে বসা মেঘ সরে শেষ বিকেলের নরম রোদ চাম্বল, শিরিষ গাছের উচুঁ মাথায় পড়ল। দেখে মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল আরমানের। হঠাৎ সাদা বক দলবেধে উড়ে গেল রোদ পড়ে সাদা যেন চকচক করছিল। সেদিকে তাকিয়ে ভাবছে শহরে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলে রিলস,কার্টুন দেখত, ফানি ভিডিও দেখত, গেম খেলত। কিন্তু সেই আনন্দ ছিল ক্ষণস্থায়ী। এখানে গ্রামের প্রতিটি মুহূর্ত যেন জীবন্ত। প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি গন্ধ তার মনে এক নতুন অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল।
সে উপলব্ধি করল, চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকা জীবনের চেয়ে মুক্ত প্রকৃতির মাঝে থাকা কত বেশি আনন্দের! এখানে বন্ধুরা একসঙ্গে খেলে, হাসে, গল্প করে। কেউ একা নয়।
কয়েক সপ্তাহ পর দাদার শরীর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠল। এবার শহরে ফেরার সময় হলো। বিদায়ের দিন আরমানের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। রনি, সজীব, মিলন আর রাকিবকে জড়িয়ে ধরে সে বলল,
—"আমি আবার আসব। তোমাদের খুব মনে পড়বে।"
বাস যখন গ্রাম ছেড়ে শহরের পথে চলতে শুরু করল, আরমান জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ভেজা মাঠ, কদমগাছ, পুকুর, কাঁচা রাস্তা—সব ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।
আরমান চলে গেল শহরে ঠিকই কিন্তু মনটা তার গ্রামেই পড়ে রইল। 
গ্রামের সেই বর্ষার দিনগুলো তার হৃদয়ে গেঁথে গেল চিরদিনের জন্য। মাটির সোঁদা গন্ধ, কদমফুলের সুবাস, ব্যাঙের ডাক, শীতল বাতাস আর বন্ধুদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা হৈ-হুল্লোড় তাকে শিখিয়ে দিল—প্রকৃতির সান্নিধ্যে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা কোনো মোবাইল, টিভি কিংবা চার দেয়ালের বন্দি জীবনে কখনো পাওয়া যায় না।

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post