আষাঢ়-শ্রাবণের মুষল ধারার বৃষ্টিতে কুসুমপুরে বর্ষা নেমে এলো। এমন বর্ষার দিনে বাদল মামা ভরা বাদলে ভিজে তার ভাগ্নি বর্ষাকে কুসুমপুরে নিয়ে এলেন। তার মেয়ে বৃষ্টিও তার সাথে ছিল। বর্ষা ও বৃষ্টি প্রাথমিকে পড়ুয়া চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। বর্ষা দিনে বর্ষার পছন্দের খাবার ভুনা খিচুড়ি ও ইলিশ মাছ ভাজি। তাই তার নানি আগেই ইলিশ মাছ ভাজি ও ভুনা খিচুড়ি রান্না করে রেখেছিলেন। বর্ষা নানির হাতের রান্না মজা করে খেলো। বৃষ্টি থামলে বর্ষা বায়না ধরল বিলে বেড়াতে যাবে। বর্ষার আবদার রাখার জন্য বাদল মামা নৌকার সন্ধান করলেন। নৌকার সন্ধান করতেই তার নানা বললেন ডিঙ্গি ঘাটেই বাঁধা আছে। বর্ষা তার মামা এবং মামাতো বোন বৃষ্টি নৌকায় উঠলো। নৌকায় উঠেই বর্ষা মামাকে প্রশ্ন করল, "মামা, তুমি বললে নৌকার কথা, নানা বলল ডিঙ্গির কথা, ডিঙ্গিটা আবার কি"? মামা বললেন,"ডিঙ্গি একটা নৌকার নাম। আমাদের দেশ একটা নদীমাতৃক দেশ। নদীতে চলাচলের জন্য নৌকার প্রয়োজন। তাছাড়া বহু অঞ্চলে বর্ষায় চলাফেরার জন্য নৌকাই ভরসা। তোমার নানার কাছে শুনেছি আগের দিনে বর্ষার সময় আমাদের এখানেও নৌকা দিয়েই সকল প্রকার যাতায়াত চলতো। এই যাতায়াতের কাজে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের নৌকা ব্যবহৃত হতো। নৌকার গঠন অনুযায়ী নৌকার বিভিন্ন ধরনের নাম ছিল। যেমন ছিপ, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না, পানসি, রপ্তানি, সওদাগরী, কোষা, পাতাম, বাচারি, ঘাসি, সাম্পান, ফেটি নায়রি, ইলশা, কেড়াই নৌকা, পাল তোলা নৌকা, বেদে বা সাপুরিয়া নৌকা, ভোট নৌকা, গত্তীবিলাস, লক্ষী বিলাস, বেটচোরা নৌকা, খেয়া নৌকা, বাইচের নৌকা ইত্যাদি"। বর্ষা ও বৃষ্টি হা করে শুধু শুনে গেল। বৃষ্টি, বর্ষাকে বলল," বাবা আমাকে কাগজের নৌকা বানানো শিখিয়েছে। তোমাকে আমি কাগজ দিয়ে কিভাবে নৌকা বানাতে হয় শিখিয়ে দেব"। বর্ষা খুব খুশি হল।
বাদল মামা বাঁশের একটা লগি দিয়ে বিলের দিকে নৌকা চালালেন। বর্ষা দেখল বিলের মধ্যে এসে একটা হিজল গাছ যেন বর্ষার জলে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। সে আরও দেখল হিজল গাছের ডালে একটা মাছরাঙ্গা পাখি মাছ ধরতে চুপ করে বসে আছে। যেন ধ্যান ধরেছে। দেখতে দেখতে ঝুপ করে একটা ছোট মাছ ধরে আবার উড়ে গিয়ে ডালে বসলো। বর্ষা এই ঘটনাটা বৃষ্টিকেও দেখাল। তারা দুজনেই খুব মজা পেল। এবার বর্ষা দেখল চারিদিকে শাপলা ফুল তারি মাঝখান দিয়ে তাদের নৌকা চলল। বর্ষা ও বৃষ্টি বায়না ধরল তারা শাপলা ফুল তুলবে। মামা নৌকা একখানে স্থির করলেন। তারা শাপলা ফুল তুলল। এবার মামা প্রশ্ন করলেন, "তোমরা কয় রঙের শাপলা ফুল দেখলে"? ওরা বলল," সাদা ও লাল শাপলা"। মামা বললেন," বলতো আমাদের জাতীয় ফুলের নাম কি"? ওরা দুজনেই বলল, "শাপলা"। মামা আবার বললেন, "আসলে আমাদের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা"। ওরা আগে এটা জানতো না। আজ জানলো। আকাশে ছোট ছোট সাদা মেঘগুলো একত্রে জড়ো হয়ে ঘন কালো হয়ে আসলো। মামা বললেন," তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। বৃষ্টি আসবে"। বর্ষা বলল, "মামা বৃষ্টিতে ভিজবো"। মামা বললেন, "নৌকায় উঠে বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক না। মুষলধারে বৃষ্টি আসলে বৃষ্টির জলে নৌকা ভরে গিয়ে ডুবার সম্ভাবনা আছে"। বৃষ্টি বলল ,"আমি সাঁতার জানি"। বর্ষা চুপ করে রইল। মামা বললেন," বর্ষা তো সাঁতার জানে না। সব মানুষের সাঁতার জানা জরুরী"। বর্ষা বলল" মামা আমাকে সাঁতার কাটা শেখাতে হবে"। মামা রাজি হলেন।
বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই বৃষ্টি নেমে গেল। বর্ষা ও বৃষ্টি দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজলো। তারা বিলে লক্ষ্য করল থৈ থৈ জলে কেউ ছোট ছোট নৌকা ভাসিয়ে কেউ বা আবার কলার ভেলায় চড়ে মাছ ধরতে ব্যস্ত। নাম না জানা অনেক পাখি বৃষ্টিতে ভিজে তাড়াহুড়া করে নিজের গন্তব্যে চলছে। পূবালী বাতাস বইল। এমন সময় বাতাসে কদম ফুলের সুবাস তাদের নাক ছুঁয়ে গেল। তারা এমন গন্ধে খুব বিমোহিত হলো। মামা বললেন," কি কদম ফুলের গন্ধ পেলে, তাই না? এমন আরো অনেক ফুল বর্ষায় ফোটে। যেমন- লাল রঙ্গন, কলাবতি, কামিনী, জুঁই, বেলি, চাঁপা, বকুল, মাধবীলতা, অপরাজিতা, কুন্দফুল, দোপাটি, কেয়া, জুথি, চামেলি, কেতুকি, মালতি, চন্দ্রপ্রভা, ঝুমকোলতা, দোলনচাঁপা, মোরগঝুটি, সন্ধ্যামণি, জিনিয়া, টগর, গন্ধরাজ, বাগান বিলাস, শ্বেত রঞ্জন, অলকানন্দা, রজনীগন্ধা, হাসনাহেনা ইত্যাদি"। বর্ষা বলল, "বর্ষা কালে এত ফুল ফোটে মামা"! মামা বললেন, "বর্ষায় আরো অনেক ফুল ফুটে, যে ফুলগুলো আমাদের চোখে পড়লেও তেমন মনে রাখি না। সে ফুলগুলি যেমন পদ্ম, শাপলা, ঘাসফুল, পানাফুল, কলমিফুল, কেশর দাম, পানিমরিচ, পাতা শ্যাওলা, পাটফুল, বনতুলসী, নলখাগড়া, ফনিমনসা, উলট কম্বল, শিয়াল কাঁটা, কেন্দার, কেওড়া, হিজল, করবি, বান্ধুলি ইত্যাদি"। মামা বললেন, "এখন ঘরে উঠে এসো। বেশিক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলে অসুখ হতে পারে"। ওরা ঘরে চলে গেল। মামা বললেন, "তাড়াতাড়ি গামছা দিয়ে গা মুছে ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় পরো"। ওরা শুকনো কাপড় পড়ে নানীর ঘরে গেল। নানি তাদের দুধ-মুড়ির সাথে আম ও কাঁঠাল খেতে দিলেন। খেতে বসে মামা বললেন, "আম, জাম, কাঁঠাল গ্রীষ্মের ফল হলেও এগুলি বর্ষায়ও পাওয়া যায়। তাছাড়া বর্ষায় লটকন, আমড়া, জাম্বুরা, জামরুল, ডেউয়া, করমচা, কামরাঙ্গা, কাউ, গাব, পেয়ারা, আঁশফল, আনারস, তাল, ড্রাগন ইত্যাদি ফল পাওয়া যায়। বর্ষার ফল গুলো অনেক পুষ্টি মানের"। রাতে ভাত খেতে খেতে বর্ষা মামাকে বলল, "মামা আমি কিন্তু কালকে নৌকা করে বাড়িতে যাব"। মামা বললেন, "ঠিক আছে, আগামীকাল তোমাকে ইঞ্জিনের নৌকা করে তোমার বাড়িতে দিয়ে আসব"। বর্ষা বলল, "সেটা আবার কেমন নৌকা"? মামা বললেন, "সেটা কালকেই দেখতে পাবে"। বাদল মামা পাশের বাজার থেকে কিছু লটকন, পেয়ারা ও আনারস কিনে ইঞ্জিনের নৌকায় চড়ে বর্ষাকে বাড়িতে পৌঁছাতে চললেন। বর্ষাকে বাড়িতে দিয়ে বাদল মামা যখন বাড়িতে ফিরলেন তখন শেষ বিকেলের কড়া রোদ শাপলা বিলের বর্ষার জলের সাথে খেলা করছিল।
