মধ্যরাতের ঘ্রাণ ও অন্যান্য কবিতা ।। দীপঙ্কর শুভ

 


মধ্যরাতের ঘ্রাণ


এখন মধ্যরাত; চোখের তারায় ঘুম-পাখিদের সুষম সুর।
হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠি,
পাই ডিম ভাজার করকরে গন্ধ;
এক তীব্র আদিম ঘ্রাণ—
ধীরে ধীরে নেমে গিয়ে জমা হয় নাভিমূলে।
সেই নাভিমূল থেকে কিছু কথা উড়তে পারতো,
হতে পারতো ছাতিমতলার ছায়াঘন অন্ধকার;
কিংবা সোনালি ডানার চিল,
লাল শাপলার মেলা,
অথবা তোমার বুকের কোনো চেনা তিল।


সুর ও মাছের কাঁটা


তুমি যে গান লেখো—
আমি গাই ভুলভালে;
তবুও সেই সুর ধরে স্বপ্নেরা হেঁটে যায় পুব থেকে সুদূরে,
যেখানে কলমের কালিতে সন্ধ্যা নামে,
আর চেনা পাখিরা ডানা মেলে চলে যায় বহুদূরে।
আমি না হয় একটুখানি ভুলভালই বকি,
চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে মুখ দিই প্রতিদিনের প্রাত্যহিকতায়।
সংসার আসলে এক নিখুঁত সুরের খোঁজে ছোটে,
আর আমি ভুল তানে মেপে নিই জীবনের পরমায়ু;
তবুও তো দিনশেষে, সব কোলাহল আর ছুটির ক্ষণে—
সেই ভুল সুরে, সামান্য মাছের কাঁটাতেও
আদতে তোমাকেই স্পর্শ করছি।


মগজের সালোনে


যদি সময় বদলায়, সেই আশায়—
চা মাখিয়ে নিও মগজের সালোনে।
বাহ্, চমৎকার তো!
এক প্লেট ঠান্ডা ভাতে রাজনীতির মেনিমাছ।
পেট্রোল বোমা জমে থাক ড্যান্ডি খাওয়া কিশোরের হাতে,
ভাপ ওঠা দীর্ঘশ্বাস চোখে নিয়ে;
দগ্ধ অয়নের মুখে আরেকটু লেপে দিও প্রিয় স্লোগান—
"পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা।"
যখন মাছরাঙার মতো নীরব ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে মানবতা,
তখন আদর্শ—কেবলই এক ফালি শসার টুকরো;
দেখা যায় লেবুর কোষে শোষণের ধারালো দাঁত।
আর গণতন্ত্র? সে তো প্রলেপ দেওয়া এক উঠোন—
বলি কী, খেলেই যাও!
রেফারি তো এখনও টয়লেটে, খুচরো পয়সা গুনতেই ব্যস্ত।
সবই বদলাবে—চেয়ার থেকে শুরু করে প্রেমিকা;
শুধু বদলাবে না এক চিরন্তন ইতিহাস—
তুমি, আমি, আমরা... এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান!


এক ভূখণ্ড নীরবতা

এক ভূখণ্ড নীরবতায় মোড়ানো কলাবউয়ের মুখ—
কেউ দেখেনি কোনোদিন;
দেখেনি ক-ফোঁটা জল তার নাভি ভিজিয়ে,
পায়ের আঙুল ছুঁয়ে আলগোছে চুমু খায়।
কারও মনে পড়ে না তার কথা, কেউ মনে রাখে না;
শুধু মানচিত্রের নদী ধরে, কলিজার পাহাড় বেয়ে
সে আচমকা ওপরে উঠে আসে।
ওহে উপেক্ষিতা নারী,
কাশফুলের মতো পবিত্র জননী তুমি—
তোমার এই ম্লান শরীরে এবার
বৃক্ষের বাকলের মতো নিবিড় ভালোবাসা জন্মাক!


নাটাইয়ের সুতো

আজ মাটির মেঠো গন্ধ—
শিশুর চঞ্চলতায় পাখি
উড়ে চলে আসে নিঃশ্বাসের গভীর সমুদ্রে।
বছরান্তের যোগ কিংবা বিয়োগ,
সবই তো নিছক কালক্ষেপণ;
সে কথা সময় নিজেই জানিয়ে দিয়েছে
জলপাই পাতার নিবিড় শূন্যতায়।
কতদূর হেঁটে এসেছি আমি—
ঠিক যতখানি সুতো জড়ানো ছিল জীবনের নাটাইয়ে!
অথচ দিনশেষে, আমার জন্য কেউ তো অপেক্ষা করেনি—
না কোনো প্রেমিকা, না স্বয়ং সময়।


নাগরিক পরিচয়

আমাকে হয়তো চিনে থাকবেন—
চাইলে আমার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে পারেন;
তাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা: আমি বাংলাদেশি।
সেখানে কোথাও 'সংখ্যালঘু' কিংবা 'পাহাড়ি' শব্দটা নেই;
আছে কেবল আঙুলের ছাপ, আর হাতে লেখা নিজের নাম।
কোথাও 'মালাউন' কিংবা 'কাফের'—
মুদ্রণের ভুলেও অন্তত সেখানে উঠে আসেনি।
তবুও, আমাকে হয়তো চিনে থাকবেন!
আমিই তো ক্ষমতার মাঠে নিছক এক পোড়ানো ঘর,
আমিই পূর্ণিমার রাতে জমে থাকা সাম্প্রদায়িক দুঃখ;
আর—ত্রিপুরা শিশুর থেঁতলানো, রক্তাক্ত শিশির-মুখ!


দীপঙ্কর শুভ ১৯৯৩ সালের ২৩ মার্চ মুন্সীগঞ্জ জেলার টংগিবাড়ী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। স্নাতক সম্মান শেষ করে এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। 

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post