জলছবির অন্তরালে ।। সেখ মঈনুল হক


১.

শ্রাবণের আকাশটা সকাল থেকেই নিবিড় কালো মেঘে ঢাকা। বারাসাতের ওল্ড ক্যালকাটা রোডের ধারের পুরোনো জমিদারী ধাঁচের বাড়িটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে জাভেদ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পেশায় তিনি একজন আইনজীবী, আর নেশায় সমাজকর্মী। সারাদিন কোর্টের নথিপত্র, আইনের জটিল প্যাঁচ আর সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর সময় কাটে। কিন্তু এই বৃষ্টির দিনে, যখন টিনের চালে নূপুরের মতো শব্দে জল পড়তে শুরু করে, তখন আইনের সব ধারা যেন কোথায় হারিয়ে যায়। মনটা তখন কোনো নিয়ম মানে না, এক ছুটে চলে যায় স্মৃতির অতীতে।

আজ কোর্ট ছুটি। ড্রয়িংরুমের জানালার ভারী পর্দাটা একপাশে সরিয়ে জাভেদ সাহেব বাইরের দিকে তাকালেন। রাস্তাঘাট ইতিমধ্যেই জলে ডুবে গেছে। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে দু একটা রিকশা ধীরগতিতে জল কেটে এগিয়ে চলেছে। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।

ভেতরে এলেন সালমা বানু। তাঁর হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লবঙ্গ দেওয়া চা। জাভেদ সাহেবের দিকে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, "কী ভাবছ অত একমনে ? সেই সকাল থেকে দেখছি জানালার ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে আছ।"

জাভেদ সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, "কিছু না সালমা, এই বৃষ্টিটা দেখলেই কেন জানি না বুকশেলফে জমে থাকা পুরোনো ডায়েরিগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, এই মেঘ আসলে আকাশেরই লেখা কোনো অপ্রকাশিত ব্যথার কাব্য, যা আজ জল হয়ে ঝরে পড়ছে।"

সালমা বানু একটু হাসলেন। বললেন, "আইনের কঠোর দুনিয়ায় থেকেও তোমার ভেতরের এই কবি মনটা কিন্তু একটুও বদলাল না। যাই হোক, রায়হান বলছিল আজ বিকেলের দিকে সে একবার আসবে। একটা জরুরি সামাজিক কাজের বিষয়ে তোমার সাথে আলোচনা আছে ওর।"

রায়হান এই শহরেরই এক উদ্যমী যুবক। জাভেদ সাহেবের সমাজসেবামূলক সংগঠনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তরুণ বয়সের সেই চেনা কোলাহল আর আদর্শের সুর যেন রায়হানের মধ্যেই খুঁজে পান জাভেদ সাহেব।


২.

দুপুরের পর বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ল। একটানা বর্ষণে চারপাশটা যেন একটা জলছবিতে পরিণত হয়েছে। জানালার কাচে জলবিন্দুরা এসে জমা হচ্ছে, ঠিক যেমন মানুষের মনে জমে থাকে হাজারো অভিমান।

জাভেদ সাহেব তাঁর পড়ার ঘরে গিয়ে বসলেন। টেবিলের ওপর একগাদা আইনি ফাইল ছড়ানো, কিন্তু আজ সেসবে মন বসানো দায়। তিনি টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা পুরোনো, চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি বের করলেন। পাতাগুলো উল্টাতেই একটা শুকনো শিউলি ফুল খসে পড়ল। ফুলটার রঙ চটে গেছে, কিন্তু তার গায়ে যেন এখনো লেগে আছে কয়েক দশক আগের এক সোনালী বিকেলের ঘ্রাণ।

সে এক অন্য সময় ছিল। যখন এই শহরের বুকে এত যান্ত্রিকতা ছিল না, হাতের মুঠোয় স্মার্টফোনের নীল আলো মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়নি। তখন বর্ষা মানে ছিল কাগজের নৌকা বানানো, মাটির সোঁদা সুবাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়া, আর মেঘলা দুপুরে জানালার পাশে বসে রূপকথার গল্প শোনা। মায়ের হাতের সেই গরম খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজার সুবাস যেন আজও এই বৃষ্টির দিনে জাভেদ সাহেবের নাকে এসে লাগে। মা বলতেন, "বৃষ্টি হলো আল্লাহর রহমত, এটা মানুষের মনের সব ধুলোবালি ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়।"

মায়ের সেই চেনা মুখটা আজ বড্ড মনে পড়ছে জাভেদ সাহেবের। জীবনের ইঁদুরদৌড়ে মানুষ কত কী পেয়ে যায়, কিন্তু মায়ের সেই আঁচলের ওম আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না।


৩.

বিকেল চারটে নাগাদ কলিংবেলটা বেজে উঠল। সালমা বানু দরজা খুলতেই দেখা গেল রায়হান দাঁড়িয়ে আছে, তার ছাতাটা থেকে টপটপ করে জল ঝরছে।

"আসতে খুব কষ্ট হলো রে রায়হান ? রাস্তাঘাটের যা অবস্থা।" সালমা বানু উদ্বেগের সুরে বললেন।

রায়হান হাসিমুখে ভেতরে এসে ছাতাটা একপাশে রেখে বলল, "একটু তো কষ্ট হয়েছেই কাকিমা, তবে জাভেদ স্যারের সাথে দেখা করার তাগিদটার কাছে এই বৃষ্টি কিছুই না। আমাদের ফোরামের আগামী মাসের রক্তদান শিবির আর বন্যা দুর্গতদের ত্রাণের কাজটা নিয়ে স্যারের কিছু পরামর্শ দরকার।"

পড়ার ঘর থেকে জাভেদ সাহেব ডাকলেন, "ভেতরে আয় রায়হান।"

রায়হান ঘরে ঢুকতেই জাভেদ সাহেব ডায়েরিটা বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রাখলেন। রায়হান বসল সামনের চেয়ারটায়। শুরু হলো কাজের আলোচনা। সমাজকর্মী হিসেবে জাভেদ সাহেব সবসময়ই নিখুঁত পরিকল্পনা পছন্দ করেন। কোন এলাকায় ত্রাণ পাঠানো হবে, কীভাবে তহবিল সংগ্রহ করা হবে —  সব বিষয়ে তিনি রায়হানকে গাইড করতে লাগলেন।

আলোচনার মাঝেই রায়হানের চোখ গেল জানালার বাইরে। সে একনাগাড়ে ঝরে পড়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, "স্যার, মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা সমাজ পরিবর্তনের এত বড় বড় কথা বলি, কিন্তু প্রকৃতির এই রূপের সামনে আমরা কতটাই না ছোট। এই বৃষ্টি যেমন ধনী দরিদ্রের ভেদাভেদ না মেনে সবার ওপর সমানভাবে ঝরে পড়ে, আমাদের সমাজটাও যদি এমন সমতার হতো।"

জাভেদ সাহেব রায়হানের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, "ঠিক বলেছিস। প্রকৃতি আমাদের বড় শিক্ষাগুরু। এই যে আষাঢ় শ্রাবণের মেঘ, এ তো শুধু জল বয়ে আনে না, এ আমাদের ভেতরের রুক্ষতাকে ধুয়ে দিয়ে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাণ যেমন বৃষ্টির ছোঁয়ায় জেগে ওঠে, আমাদেরও উচিত মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতাকে এভাবে জাগিয়ে তোলা।"


৪.

সন্ধ্যা নামার আগেই রায়হান বিদায় নিল। বৃষ্টির দাপট এখন কিছুটা কমে এসেছে, তবে ইলশেগুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি চলতেই থাকছে।

সালমা বানু ঘরে এসে বসলেন। জাভেদ সাহেব তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, "জানো সালমা, আজ রায়হানের কথাগুলো শুনে আমার নিজের তরুণ বয়সের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমরাও তো এমন একটা সুন্দর, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতাম।"

সালমা বানু মৃদু হেসে বললেন, "তুমি তো এখনো সেই স্বপ্নই দেখছ, আর তা বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করছ।"

জাভেদ সাহেব জানালার দিকে চাইলেন। বাইরের আবছা আলো আর অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হলো, জীবনটাও আসলে এই বর্ষার মতোই। কখনো মেঘের ঘনঘটা, কখনো ঝড়ের তাণ্ডব, আবার কখনো সব শেষে এক চিলতে শান্ত রোদ। অপ্রকাশিত হাজারো ব্যথার কাব্য মনের কোণে জমা হয়ে থাকলেও, পরোপকার আর ভালোবাসার বৃষ্টির জলে তা একদিন ঠিকই ধুয়ে মুছে যায়।

টিনের চালের সেই নূপুরের ধ্বনি যেন এখন একলা পথের গান হয়ে তাঁর হৃদয়ে বাজছে। মেঘপিওনের খাতায় আজ এক নতুন আশার গল্প লেখা হলো, যা আগামী দিনের তপ্ত রোদেও মানুষকে শীতলতার পরশ দেবে।

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post