পাকুড়তলা বাজারের আশে পাশে তখনও সূর্যের আলো ফোঁটেনি। ভোরের কুয়াশায় সাদা অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে সূর্যের মুখ। জবুথবু শীতে কাঁপছে প্রকৃতি। পাখিগুলোর কেউ নীড় থেকে বেরোয়নি। ছোট ছোট বাছুর ছানা মায়ের কোলে ঘুমিয়ে ওম নিচ্ছে। বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে কয়েকজন মাত্র খেটে খাওয়া মানুষ। কেউ রিকশা ওয়ালা, কেউবা ভ্যান ওয়ালা। তারা কেউ রিকশায় বসে, কেউ ভ্যানের ওপর বসে গা গরম করার বৃথা চেষ্টায় বিড়িতে সুখটান দিচ্ছে। গোল করা ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাড়ছে আকাশে।
মা বলেছিলেন, এতো ভোরে বেরুসনে রিয়া। এখনও ভোর ফোঁটেনি। আশে পাশের কোনকিছু দেখা যাচ্ছে না। বাসা থেকে পাকুড়তলা পর্যন্ত যেতে কুয়াশায় তোর পুরো জামাকাপড় ভিজে যাবে। ঠান্ডা লেগে পরে শর্দি, জ্বর হবে। আমি হাসি মুখে বলেছি, কিচ্ছু হবে না মা। হোস্টেল থেকে তো সারা মাস ধরেই ভোরে বেরুচ্ছি। ক্যাম্পেইনে যাচ্ছি। আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি আমার ব্যাগপত্র গুছিয়ে দিয়েছো তো? সলেমান চাচা কিন্তু অনেক আগে থেকেই বাইরে ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মা’কে আর বেশি কিছু বলার সুযোগ দেই না আমি। সলেমান চাচার ভ্যানে চেপে সোজা পাকুড়তলার পথে রওনা দেই। এই পাঁচ কিলো পথ পাড়ি দিতে অনেকটা সময় লাগবে। পাকুড়তলায় এসে দাঁড়িয়ে থাকবে আদিত্য। ওর বাইকে চেপে প্রথমে আমি যাবো হোস্টেলে। তারপর গায়ে অ্যাপ্রোন জড়িয়ে সোজা চলে যাবো হাম-রুবেলা ক্যাম্পে। সাড়ে ন’টার মধ্যেই আমাকে পোঁছুতে হবে ওখানে। এতো কম সময়ে কমপক্ষে চল্লিশ কিলো পথ পাড়ি দিয়ে সময় মতো ক্যাম্পেইনে পৌঁছা চাট্টিখানি কথা নয়।
আদিত্যকে ফোন দিই আমি। ফোন বাজে, রিসিভ হয় না। আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, সর্বনাশ! তবে কি আজ আদিত্য ঘুম থেকে ওঠেইনি! ও তো এরকম করে না! ও সময় মতো না এলে তো আমি আজ ক্যাম্পেইনে যেতেই পারবো না। এই সাত ভোরে রাস্তায় একটাও গাড়ি পাওয়া যাবে না। তখন কি হবে! আমার চিন্তায় রেখা টানতে দেয় না আদিত্য। একটু পরেই ফোন দেয়, বাইকে আছি। আমি মহাস্থানে, তুমি কই?
বলি, আমি ভ্যানে আছি। আসছি। কতক্ষণ লাগবে তোমার?
‘কুড়ি মিনিট’।
‘আমারও সেইম। তুমি দ্রুত আসো’।
‘ওকে’ বলে ফোন কেটে দেয় আদিত্য।
আদিত্যর কথা বলি। আদিত্যর সাথে আমার সম্পর্ক এক বছরের কিছুটা বেশি। ফেসবুকে পরিচয়। সেই সুত্র ধরে হঠাৎ করেই কাছাকাছি আসা। কাছাকাছি বলতে সেইরকম কাছাকাছি না। এই যে একসাথে চা খাওয়া, কোন রেস্টুরেন্টে বসে ফাস্টফুড, এক সাথে কাছে কোথাও বেড়াতে যাওয়া আর ফোনে টুকটাক চ্যাটিং। অন্যান্য ফ্রেন্ডের সাথে আমার যেমন সম্পর্ক আদিত্যর সাথে তেমনই। আদিত্য আমার থেকে বয়সে অনেক বড়। তবে ওর মধ্যে কিছু বিশেষত্ব আছে যা অন্যান্য ফ্রেন্ডদের মধ্যে নেই। আদিত্য সৎ, দায়িত্ববান, কর্তব্য পরায়ণ, নিষ্ঠাবান আরও কয়েকটি বিশেষণ আদিত্যর নামের পাশে জুড়িয়ে দেযা যায়। আদিত্যর আরও একটা বিশেষ গুণ, ওকে ডাকলেই যেকোন সময় কাছে পাওয়া যায়। একদম ছুটে আসে আমার কথায়। অদ্ভুত মানুষ আদিত্য। আমার কোন কথায় তার না নেই। টাকা, বাজার, খাবার, যাই লাগুক আমার কেবল মুখ ফুটে বললেই চলে। ব্যাস, হাজির করে আনে সময়ের আগেই। এক আশ্চর্য রকমের মানুষ আদিত্য। ব্যাতিক্রমী। এই যুগে এতো সরল মানুষ তেমনটা দেখিনি আমি। কেন আদিত্য আমার প্রতি এতো সহজ ! জানা হয়নি আমার। আদিত্যও কোনদিন বলেনি আমাকে। আচ্ছা আদিত্য কি আমার প্রতি দুর্বল! আদিত্য কি ভালবাসে আমাকে! কি জানি! হতে পারে, আবার নাও পারে।
পাকুড়তলা বাজারে এসে ভ্যান দাঁড়াতেই আদিত্যর বাইক এসে থামে আমার সামনে। হাসি হাসি মুখ আদিত্যর। আমি ভ্যানের ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে আদিত্যর বাইকে উঠি। আদিত্য বাইক ছেড়ে দেয়। বলি, জোরে চালাও। হাতে সময় কম। সময়মতো পোঁছুতে হবে। আদিত্য বলে, বেশি জোরে চালানো সম্ভব না আজ। শীতকুয়াশায় হাত জমে গেছে এখানে আসার সময়। দেখো জ্যাকেট ভিজে গেছে। চশমার গ্লাসেও পানি।
আদিত্য মাঝারী গতিতে বাইক চালাতে থাকে। আমরা গল্প করতে থাকি। আমার বাসার সবাই কেমন আছে, কোন প্রবলেম আছে কি না। আমাদের প্রেম. ফ্রেন্ড, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গে গল্প জমে ওঠে। গল্পে গল্পে আমরা চলতে থাকি। হাসি আনন্দে মেতে থাকি।
আদিত্য আর আমার রসায়নটা এরকমই সুন্দর। আমাকে বাসা থেকে হোস্টেলে নিয়ে আসা, হোস্টেল থেকে বাসার সামনে নেমে দেয়া, নানুবাড়ি থেকে কলেজে পোঁছে দেয়া , ২৫ থেকে ৩৫ কিলো রাস্তার এই লিফটটা আদিত্য নিয়মিতই দিয়ে থাকে আমাকে। আদিত্য ফ্রি মানুষ না। অনেক অনেক ব্যাস্ত মানুষ আদিত্য। একাই তিনটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সামলায় ও। তারপরও ওকে কোন কাজের কথা বললে কখনও না করে না। আমার সবসময়ই মনে হয়, আমার যেকোন আব্দার বা ইচ্ছে পূরণের জন্য সম্ভবত আদিত্য সব সময় প্রস্তুত থাকে।
একবার একটা ঘটনা ঘটে। আদিত্যর সাথে নতুন পরিচয় তখন আমার। হোস্টেলের এক ধারে আমার ফ্রেন্ড মাহিমের সাথে বসে গল্প করছিলাম। মাহিমের ফোন নিয়ে কি যেন করছিলাম। শীতের রাত তখন। সাড়ে সাতটার মতো বাজে । হঠাৎ বিষয়টা দেখে ফেলেন কলেজের পদস্থ একজন কর্মকর্তা। আতিউর রহমান স্যার। তিনি গাড়ি থেকে নেমে আমাদের কাছে এলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ছেলেটা কে? আমি মাথা নিচু করে বললাম, ফ্রেন্ড।
‘কেমন ফ্রেন্ড , আমাদের কলেজে পড়ে?’
‘না স্যার।’
‘তাহলে এই রাতের অন্ধকারে তোমরা দুজনে এখানে কি করছো?’
আমি তোতলাতে লাগলাম। স্যার মাহিমকে বললেন, তোমাকে যেন কোন দিন এ ক্যাম্পাসে আর না দেখি। মাহিম চলে যায়। ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে গেলে ভাল হতো। কিন্তু ঘটনা ক্রমেই জট পাকাতে থাকে। আতিউর স্যার সোজা প্রিন্সিপালের কাছে আমার নামে কমপ্লেইন করেন। প্রিন্সিপাল স্যার আমার নামে নোটিশ শো করেন। একেবারে লেজে গোবরে অবস্থা। আমাকে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হবে এমন কথা সবার মুখে মুখে। ভয়ে আমি বাড়িতে চলে যাই।
রাতে অন্যান্য দিনের মতোই আদিত্য নক দেয় আমাকে, রিয়া তোমার খবর কি? কেমন আছো?
বলি, আমি বাড়িতে এসেছি। একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ঘটনাটা অনেক খারাপ।
আদিত্য বলে, হঠাৎ বাড়িতে কেন? কি ঘটনা ঘটে গেছে জানাও তো?
বিস্তারিত ইনবক্সে আদিত্যকে জানাই আমি। নিজের ভুল স্বীকার করি। এরকম আর হবে না এমনটাও প্রমিজ করি।
সব শুনে আদিত্য অনেক হতাশ হয়। একটু ভেবে নিয়ে বলে, তোমাদের কলেজে আমার পরিচিত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আছে। দেখি তোমার জন্য কি করতে পারি। আমি আদিত্যকে এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করতে বার বার চাপ দিতে থাকি। বার বার অনুরোধ করতে থাকি। অবশেষে অনেক চেষ্টা করে, মাহিমের সাথে আমার কোন রকম সম্পর্ক না রাখার শর্তে আদিত্য সে যাত্রা উদ্ধার করে আমাকে। আমি মনে মনে অনেক ধন্যবাদ দেই আদিত্যকে। আদিত্য আমাকে সে যাত্রা উদ্ধার করে ঠিকই, তবে আমাকে আমার হোস্টেল ছাড়ার শর্তে উদ্ধার করতে পারে। এটা নিয়েও আমার অনেক মন খারাপ হয়। দেড় বছর ধরে যেসব বান্ধবীর সাথে একসাথে থেকেছি, খেয়েছি, ঘুমিয়েছি। কত আনন্দ আর হাসি ঠাট্টা করেছি সেসব বান্ধবীদের ছেড়ে অন্য হোস্টেলে গিয়ে থাকতে কিছুতেই আমার মন সায় দেয় না আমার।
কিন্তু সময় বিপক্ষে। মন মেজাজ ভাল থাকে না। খাবার, ঘুম, কাজ কিছুই ভাল লাগে না। সাথে মাত্রাতিরিক্ত টেনশন। যেন নাভিশ্বাস ওঠে আমার। আদিত্য বার বার আমাকে আশ্বস্ত করে, বোঝায়। রোটার হোমে উঠতে বলে। কিন্তু রোটার হোম আমার পছন্দের না। ওখানে আড়া জঙ্গল। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নর্দমার দুর্গন্ধ। ওখানে এক রাতও কাটানো সম্ভব না আমার পক্ষে। কিন্তু কলেজের পানিশম্যান্ট অনুযায়ী ওখানেই উঠতে হবে আমার। আদিত্য আমাকে বুদ্ধি দেয়, যুক্তি দেয়। সেসব আমার কখনও পছন্দ হয়, কখনও হয় না। আদিত্য দৌড়িয়ে আসে আমার মন ভাল করার জন্য। আমাকে বেড়াতে নিয়ে যায়। ফ্রেন্স ফ্রাই, ক্যাপেচিনো, ফ্রাইড রাইস খাওয়ায়। কিšুÍ এতে আমার মন ভাল হয় না।
আদিত্যকে নিয়ে আমি হোস্টেলের খোঁজে বের হই। কিন্তু সেগুলোও আমার জন্য উপযুক্ত মনে হয় না। অবশেষে রোটার হুমেই ওঠার সিদ্ধান্ত নিই। আদিত্যকে সাথে নিয়ে তোষক কিনি। সেগুলো দুজন মিলে রোটার হোমে রেখে আসি। একদিন আদিত্যকে না জানিয়েই রোটার হোমে উঠি আমি। কিন্তু ওখানে আমার ভাল লাগে না। সারারাত ঘুম হয় না আমার। আদিত্য আমাকে ফোন দেয়। আমি ফোন ধরি না। আদিত্য টেক্সট দেয় আমাকে, আমি রিপ্লাই করি না। আদিত্য ফোন দিতেই থাকে, টেক্সট করতেই থাকে। আমি একদম রেসপন্স করি না। আদিত্য পরদিন দৌড়ে আসে রোটার হোমে। এটা সেটা বলে আমার সাথে দেখা করে। বলি, আমি রোটার হোমে থাকতে পারবো না। আমি বাড়িতে চলে যাবো। প্রতিদিন বাড়ি থেকে এসে ক্লাস করে চলে যাবো। আমি বাড়িতে চলে যাই।
বাড়িতে গেলেও আদিত্য আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে। কেমন আছি, কি করছি, আমার মা বোন কেমন আছে এসব জিজ্ঞেস করে। নিয়মিত সবার খোঁজ নেয়। বাসায় কিছুদিন থাকার পরে আর ভাল লাগে না আমার। আদিত্যর সাথে পরামর্শ করে ফের শহরে ফিরি। লাইলী ভিলা ছাত্রী নিবাসের খোঁজ পাই। আদিত্যর সাথে পরামর্শ করে আমি লাইলী ভিলাতে উঠে যাই। এখানে আমার অনেক ভাল লাগে। আদিত্য বাজার করে দিয়ে যায়। যখন যা লাগে দিয়ে যায়। কখনও কিছু না বললেও নিজে ইচ্ছেমতো অল্প করে মাছ. মাংস, তরমুজ, আপেল, পেয়ারা, আঙুর, চকলেট, চিপস, আঁচার এগুলো দিয়ে যায়। আদিত্য এলে আমি ওর বাইকে বসে কোনদিন ক্যান্টিনে বসে চা খাই। কোনদিন অন্য রেস্টুরেন্টে বসে ফাস্টফুড। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের। অনেক ভাল চলতে থাকে। দিনে তিন চার বার চ্যাটিং, মাঝে দুএক বার ছোট ফোনকল। আদিত্যই নক করে আমাকে। আমি সাধারণত নক করি না। যখন কোন কোন কিছু প্রয়োজন লাগে তখন নক করি।
যেভাবে চলছিলো সেভাবে চললে ভালই হতো। কিন্তু চলে না আর। করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় দেশে। বেড়ে যায় আতংক। শুরু হয় লকডাউন। মেসের মালকিন ডেকে বলেন, এখন আর এখানে থাকা যাবে না। অগত্য চিন্তা করতে হয় আবার বাড়ি ফেরার। আদিত্যর সাথে এনিয়ে নিয়মিতই কথা হতে থাকে আমার। অবশেষে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আদিত্য সায় দেয় আমাকে বাড়িতে যেতে। বলে, আমি তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে চাই। একবার তোমাদের বাড়ি দেখতে চাই। তোমার মা বোনকে দেখতে চাই। আগেও এরকম বলেছিলো আদিত্য একাধিক বার। আমি বলেছিলাম, সময় সুযোগ হলে নিয়ে যাবো একদিন। কিন্তু সবকিছু পক্ষে না থাকায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। এবার আর না করি না। মহামারী করোনা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, জানি না। আমরা কে বাঁচবো, কে মরবো জানি না। অন্তত আদিত্য আমার জন্ম ভিটাটা দেখুক।
সেদিন ছিলো ২১শে এপ্রিল, ২০২০ সাল। রাতে ভীষণ ঝড়বৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষতি হয় মানুষের ঘরবাড়ির। গাছপালা ভেঙ্গে একাকার। বিদ্যুৎ না থাকায় আমার ফোনে চার্জ প্রায় ছিলোই না। ভোর ফুটতেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে মেসের সামনে এসে দাঁড়ায় আদিত্য। আমাকে নক দিতেই অল্প সময়ের মধ্যেই বের হই আমি। গেটে আসতেই দুজনের চোখাচোখি হয়। কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকি পরস্পরের দিকে। এই তাকিয়ে থাকার ভাষা আলাদা। দুজনের হৃদয়েই হৃদয় ভাঙ্গার বিশাল কষ্ট। হায়রে! আর বুঝি দেখা হবে না আমাদের। আর বুঝি বেঁচে থাকা হবে না এই সুন্দর পৃথিবীতে!
মন খারাপ নিয়ে আদিত্যর বাইকে বসি আমি। বলি, সামনের পার্কে যাও। কিছু ছবি তুলে তারপর বাসায় যাবো। আদিত্য রোটার হোমের সামনের পার্কে গিয়ে দাঁড়ায়। তখনও অনেক ভোর। আশে পাশে কোন জনমানব নেই। আমার ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে পরস্পরের কিছু ছবি তুলি আমরা। আগেও এরকম ছবি তুলেছি আমরা। কিন্তু আজকের ছবি তোলার বিষয় অন্যরকম। হয়তো শেষ বারের মতো ফ্রেমবন্দি হলাম আমরা! আর হয়তো সময় হবে না!
বেশিক্ষণ ধরে ছবি তুলতে ভাল লাগে না। দুজনেরই ভয়াবহ মন খারাপ। আদিত্য বলে, চলো এবার তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেই। আমি চুপ করে আদিত্যর বাইকে গিয়ে বসি। আদিত্য বাইক ছেড়ে দেয়। আগে এই পথে যেতে যেতে কত কথা হতো আমাদের। কত হাসি আনন্দ ঝগড়া হতো। আজ কিছুই হয় না। বুকের ভেতর কষ্টের আগুন। চোখ ফেঁটে যেন জল বেরিয়ে পড়বে। বুঝে যাই, আমরা দুজনেই চোখের জল আটকিয়ে রাখার যুদ্ধে লিপ্ত।
দীর্ঘ সময়ের নীরবতা ও যাত্রাপথ পাড়ি দিয়ে এক সময় আমাদের বাড়িতে পৌঁছি আমরা। আগের রাতের ঝড়বৃষ্টির কারণে আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত হয়ে যায়। ভিন্ন পথে গেলেও সেই কর্দমাক্ত পথ মাড়িয়ে আমাদের বাড়িতে পৌঁছি। আদিত্য দেখা করে আমার মা বোনের সাথে। কিছুক্ষণ কথা বলে ওদের সাথে। এরপর আদিত্য তাড়াহুড়ো করে ফেরার। আমি বলে বলে কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখি ওকে। বাসায় বিদ্যুৎ নেই। আলো আঁধারিতে আদিত্যকে সকালের খাবার খাইয়ে বিদেয় করি। ফেরার সময় আদিত্যর সাথে শেষ বারের মতো দৃষ্টি বিনিময় হয় আমার। শেষ বারের মতো কষ্ট বিনিময় হয়।
এরপর আদিত্যর সাথে আর দেখা হয় না আমার। কেবল কথা হয়। তাও ফোনে নয়। মেসেঞ্জারে। টেক্সটে। আমি বাড়িতে আসার পর প্রথম প্রথম আদিত্যর সাথে অনেক কথা হতো আমার। এরপর আমি গেমস-এ মত্ত হয়ে যাই। অনেকগুলো ফেসবুক গ্রুপের সাথে নিজেকে জড়াই। ফেসবুকেও আমার বন্ধু বাড়ে অনেক। দিনরাত গেমস, বিভিন্ন গ্রুপ আর অন্যান্য ফ্রেন্ডদের সাথে চ্যাটিংয়েই ব্যাস্ত থাকি। আদিত্যর সাথে আমার দূরত্ব বাড়তে থাকে। আদিত্যর জন্য না। আমার জন্য। আদিত্য সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত চারবারই নক দেয় আমাকে। নিয়ম করে। আমিই ঠিক মতো রিপ্লাই দেই না। কারণ ততদিনে রিয়াজ নামের একটা ছেলের সাথে প্রেমে জড়িয়ে ফেলেছি নিজেকে। তখন আমার অধিকাংশ সময় রিয়াজকেই দেই। আদিত্যকে দেই না। আদিত্য মন খারাপ করে, রাগ করে, অভিমান করে। দুএকদিন কথাও বন্ধ রাখে। তাতে তেমন একটা সমস্যা হয় না আমার।
তখন রিয়াজই আমার ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা। রিয়াজ আমার পরিবারের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। বাসায় এসে আমার মা বোনের সাথে গল্প করে। বাজার করে দেয়। লক ডাউনের মধ্যেও রিয়াজ আমাকে ঘুরতে নিয়ে যায়। ফেসবুকে আমার পোস্টে রিয়াজ ভিন্নধর্মী কমেন্টস করে। সেগুলোর স্ক্রীণশর্ট আমাকে পাঠায় আদিত্য। জানতে চায়, ছেলেটা কে? তোমার প্রতি ছেলেটার এতো আগ্রহ কেন? আদিত্যর কথাগুলো আমি কৌশলে এড়িয়ে যাই। বন্ধু, ভাইয়া, গেমস খেলার সংগী এসব বলে পাশ কাটিয়ে যাই। একবার এক সকালে হুট করে আমার আর রিয়াজের ছবি পোস্ট করি ফেসবুকে। সেদিন রাগ করে আদিত্য আমাকে আনফ্রেন্ড করে। পরে আবারও আমার ফ্রেন্ডলিস্টে যুক্ত হয়। আদিত্যর সাথে আমার দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে। আমার যখন টাকার দরকার, ফ্লেক্সি দরকার, জামা কেনা দরকার, চুলে স্পা বাজার করা, বিদ্যুৎ বিল দেয়া দরকার তখনই কেবল আদিত্যকে নক দেই আমি। আদিত্য বিনা বাক্য ব্যায়ে আমার কথা শোনে । আমার সব আব্দার পূরণ করে যায়।
রিয়াজের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়তে থাকে। আদিত্যর সাথে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। করোনা প্রাদুর্ভাব কমে এলে ফের লাইলী ভিলাতে উঠি আমি। এবারও আদিত্য আমাকে সহযোগীতা করতে থাকে। কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে আমার যখন যা লাগে সবই কিনে দিয়ে যায়। আগের মতো। একদিন একটা বিষয় নিয়ে রিয়াজের সাথে আমার তুমুল ঝগড়া হয়। ওর সাথে কথা বন্ধ করে দেই আমি। কোন ফোন রিসিভ করি না। কোন টেক্সটের রিপ্লাই দেই না। এর মধ্যে হুট করে একদিন রিয়াজ বিয়ে করে ফেলে অন্য একটা মেয়েকে। আমি মানসিক ভাবে দুমড়ে মুষড়ে পড়ি। আমার প্রায় মরণ দশা হয়। রাগে, দুঃখে,অভিমানে একবার গলায় দড়ি দিতে যাই আমি। আমার গলায় ফকিরের তাবিজ ওঠে। আদিত্য আমাকে তাবিজ কিনে দেয়। গলার মাদুলী কিনে দেয়। অষুধ কিনে দেয়। রিয়াজকে ভুলতে আমি আরও দুটো ছেলের সাথে নিজেকে জড়াই। কিন্তু সেগুলো পরে আর টেকেনি।
একবার আদিত্যর কাছে সাইকেল কেনার বায়না ধরি আমি। বড় মেয়ে মানুষ রাস্তায় সাইকেল চালাবে, ব্যাপারটা পছন্দ করে না আদিত্য। তবু আমার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আদিত্য সাইকেল কিনে দেয় আমাকে। আমরা দুজন মিলে মার্কেটে গিয়ে সাইকেল কিনে আনি। পরদিন বিকেলে আদিত্যর সাথে পার্কে বেড়াতে যাওয়ার কথা আমার। আদিত্য বিকেলে নক দিলে আমার অসুস্থতার কথা বলে পাশ কাটাই আমি। কারণ তখন আমি মাহিমের সাথে পার্কে ঘুরতে যাবো। আদিত্যকে না বলে দিয়ে আমি মাহিমের সাথে পার্কে ঘুরতে যাই। মাহিমের সাথে সন্ধ্যা অবধি অনেক ভাল সময় কাটাই আমি। অনেক ছবি তুলি দুজন দুজনের। তখন সন্ধ্যাও অনেক ঘনিয়ে এসেছে। আশে পাশে তেমন কেউ নেই পার্কে। সবাই প্রায় চলে গেছে যার যার গন্তব্যে। কেবল আমি আর মাহিম আছি দূরে নদীর ওপর ভেসে থাকা ঝুলন্ত ব্রীজে। অবশেষে ফেরার পথে পা বাড়াই আমি আর মাহিম। ব্রীজ বেয়ে রাস্তার ওপর উঠতেই দেখি আদিত্য আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আদিত্যর মন অনেক খারাপ তখন। যেন দুচোখ দিয়ে জল বেরুবে ওর। আমিও হঠাৎ আদিত্যকে চোখের সামনে দেখে একদম কিংবর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। শুধু ‘কি খবর!” এরকম একটা শব্দ বের হয়ে যায় আমার মুখ দিয়ে। ‘এই তো ভাল।’ এরকম একটা দায়সারা উত্তর দিয়ে আদিত্য দ্রুত চলে যায় বাইক চেপে। আমি মাহিমের সাথে রুমে ফিরে ওকে বিদায় দেই।
এরপর অনেক কিছু হতে পারতো। অনেক ঘটনা ঘটাতে পারতো আদিত্য। অনেক কথা শোনাতে পারতো আমাকে। কিন্তু আদিত্য কিছুই করেনি। শুধু নীরবে ওর কষ্টের কথা বলেছে সামান্য। এরপর কয়েকদিনের মান অভিমানের পর আবার আমাদের সম্পর্ক প্রায় ঠিক হয়ে যায়।
একবার আমার ক্যামেরা ধার নেয় আদিত্য। ক্যামেরাতে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ছেলের সাথে, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্নভাবে ওঠানো আমার ছবিগুলো দেখে। অনেক ছবি ছিল আমার যা আপত্তিকর। এবার অনেক মন খারাপ করে, অনেক রেগে যায় আদিত্য। আমাকে শুধু একটা টেক্সট করে, এবার আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার। এ ঘটনার মাত্র দুদিন পর হুট করে কক্সবাজার চলে যায় আদিত্য। কক্সবাজারে গিয়ে আদিত্য আমাকে ফোন দেয় না। টেক্সট দেয় না। আমার সাথে কোন যোগাযোগ করে না। আমিও আদিত্যকে ফোন দেই না। কোন যোগাযোগ করি না। আমি চলি আমার মতো। একদিন ফেসবুকে দেখি আদিত্যর আইডি ডিজেবল। আদিত্যকে আর পাই না আমি। অভিমানী আদিত্য হারিয়ে যায় আমার জীবন থেকে।
লক ডাউন পুরোপুরি কেটে গেলে ফের আমি মেসে ফিরি। আমার সেই প্রিয় লাইলী ভিলা। আমার দিন যায়, রাত যায়, সকাল হয়। কিন্তু আমার সেই প্রিয় আদিত্য আর আসে না আমার কাছে। আদিত্যর ফোন বন্ধ পাই। আদিত্য একেবারে হারিয়ে যায় আমার জীবন থেকে। আমার জীবনের ছায়া থেকে।
সময় গড়িয়ে যায়। আমার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়। এক সময় বিয়ের জন্য বাসা থেকে খুব তাড়া আসে আমার। নিজের পছন্দের বাইরে বাবা মা’র পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করি আমি। খোঁজ পেলে হয়তো আদিত্যকে আমি নিজে গিয়ে আমার বিয়ের দাওয়াত দিয়ে আসতাম। আমার সে সুযোগ হয় না। অথচ আমার বিয়ে নিয়ে কত উৎসাহ উদ্দিপনা ছিলো আদিত্যর মধ্যে। নিজ হাতে আমার বিয়ের বাজার করবে, বরযাত্রীর খাবার তদারকি করবে। অতিথিদের কি কি খাওয়াবে, জামাইকে কি খাওয়াবে, কি কি মজা করবে সবকিছুই একদম মুখস্থের মতো গড়গড় করে মাঝে মধ্যে বলে আমাকে ক্ষেপাতো আদিত্য।
এখন আমি স্বামীর বাড়িতে। আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় দুবছর হতে চললো। আমি এখন প্রেগনেন্ট। আর মাস দুয়েক পরেই একটা ছেলে হবে আমার। এখন আমার সবকিছুই আছে। স্বামী, শ্বশুর শ্বাশুড়ি, ননদ, দেবর। নগদ টকা পয়সা, বাড়ি, স্বামীর চাকরী । সব আছে আমার সব। আমার কেবল একজনই নেই, সে হলো আদিত্য। আদিত্য এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, কিভাবে আছে! আদিত্য আদৌ বেঁচে আছে কি না জানি না আমি। কিছুই জানি না। তবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে বুঝতে পারছি আদিত্যর মতো একজন বিশ্বস্ত, দায়িত্ববান বন্ধু অনেক দরকার ছিলো আমার। যে সবসময় আমাকে বুঝবে, আমার প্রয়োজন গুলো বুঝবে। আমার রাগ অভিমান বকাঝকা গুলো হজম করে ফোন করে হাসিমুখে বলবে, কি আমার ওপর রাগ করে আছো? আচ্ছা এক প্লেট বিরিয়ানী এনে দিলে তোমার রাগ ভাঙবে তো! এক প্লেট ফুচকা এনে দিলে!
এখনও রাত যখন গভীর হয়, ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন দোতলার ব্যালকোনীতে এসে দাঁড়াই আমি। আদিত্যকে ভাবি। আদিত্যকে অনেক ক্ষণ ধরে ভাবতে কেন যেন অনেক ভাল লাগে আমার!
