সুদ ।। আব্দুল খালেক ফারুক

 


সকালে অফিসে বসেই দৈনিক পত্রিকার পাতায় চোখ বোলান বজলুর রশিদ। খুন, রাজনৈতিক হাঙ্গামা, আদালতে আসামীর উপর ডিম নিক্ষেপ, বাংলাদেশ দলের শোচনীয় হার-এমনতর হরেক খবরে ঠাসা পত্রিকা। 
হেডলাইন যতই উত্তেজক হোক, বজলুর রশিদকে তা স্পর্শ করে না। তার আগ্রহ ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমলো কী না-এই খবরেই সীমাবদ্ধ। তাঁর ধারণা, আগের রেজিমে ব্যাংক লোনের সুদের হার ওয়ান ডিজিটে রাখার চেষ্টা ছিল। ইন্টারিয়াম এসে সুদের হার বাড়াতে বাড়াতে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বোঝা মুশকিল। তার ফ্যাক্টরি যে ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ, তার সুদের হার পনের পারসেন। চড়া সুদে ব্যবসা করতে গিয়ে ফ্যাক্টরি বন্ধের উপক্রম। আরো কত লস করবেন? 
চট করে পাঁচের পাতায় চলে যান তিনি। ব্যবসা বাণিজ্যের সংবাদে সুদের হার কমার বিষয়ে কোন সুখবর আছে কীনা-চোখ দুটো পূর্ণমাত্রায় খুলে তন্ন তন্ন করে খোঁজেন। 
কিন্তু, না। হতাশ বজলুর রশিদ। অস্ফুট উচ্চারণে একটা গালি দেন। কার উদ্দেশ্যে গালি দিলেন, বোঝা গেল না। হয়তো নিজের ভাগ্যকে শাপান্ত করছেন। 
অফিসের পিয়ন কোরবান আলী সালাম দিয়ে এককাপ চা সামনে রাখে। চায়ের ধোঁয়ার কুন্ডুলি উড়ে যাচ্ছে ছাদের দিকে। বজলুর রশিদ সেদিকে তাকিয়ে তার ব্যবসার ভবিষ্যত নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যান। ফ্যাক্টরি বন্ধ হলে দায় দেনার কী হবে-চিন্তা করতেই তার গলা শুকিয়ে যায়। 
 মোবাইলের চিৎকারে তার চিন্তার সূত্র কেটে যায়। 
কল দিয়েছেন আরেক ব্যবসায়ী পরিমল সমাদ্দার। ঝানু ব্যবসায়ী। পূর্ব পুরুষ মারোয়ারি। ব্যবসায়ী রক্ত। কিন্ত চিপায় পড়ে হাঁসফাঁস করছেন। ব্যাংক ঋণের সুদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অর্ডার বাতিলসহ নানান হুজ্জতে তার ব্যবসা লাটে ওঠার জোগার। 
-বজলু ভাই, কেমন আছেন?
-আরে ভাই ভালো থাকি কেমনে, আপনে বোঝেন না?
-ইলেকশন কী হইবো ভাই?
-এটা একটা লাখ টাকার কোশ্চেইন করছেন দাদা। আমিতো দাদা জ্যোতিষি নই। কেমনে বলি!
-তা ঠিক। ইলেকশনের আশায় দাঁত কামড়াইয়া পইর‌্যা রইছি। বুঝছি, ইন্টারিম সরকার থাকলে সুদের হার কমার কুনো সম্ভাবনা নাই। 
-সেটাইতো দেখতাছি। একেক পার্টির একেক দাবী। মিলাইবো ক্যামনে। ভোট নিয়া কী সার্কাস শুরু হয় মাবুদ জানে। 
-ভোট পিছাইয়া গ্যালে কী হইবো ভাই?
-কী আর হইবো। ফ্যাক্টরি বন্ধ করতে হইবো। সুদ আর চান্দা দিয়াইতো সর্বশান্ত হইতাছি। 
-আমিতো একটা গার্মেন্স কারখানা বন্ধ কইর‌্যা দিছি। গেটে লে অফ সাইবোর্ড লাগাইয়া দিছি। এহন শুনলাম লেবাররা হাউকাউ করতাছে। আমার চামড়া তুইল্যা নিয়া হেগোর জুতা বানাইতাছে।
-বন্ধ না কইর‌্যা উপায় কী? কত আর লস করবেন? এই দ্যাশে ব্যবসা করাও পাপ...।
পরিমল সমাদ্দারের আর কোন কথা শোনা গেলো না। হঠাৎ করেই লাইনটা কেটে গেল। হয়তো শ্রমিকরা মারমুখি হয়ে ভাংচুর শুরু করেছে। খবর পেয়ে থানা পুলিশ করার জন্য ছুটছেন।  কারখানার ভাগ্যে কী আছে বলা মুশকিল।
পরিমল বাবুর চিন্তা কী করবেন? নিজের চিন্তাইতো অস্থির বজলুর রশিদ। রাতে ঠিকমত ঘুম হয়না। খাবারে অরুচি। প্রেসার অলওয়েজ হাই থাকে। নিচে ৯০ উপরে ১৫০। ঘন ঘন মূত্রচাপ। মনে হয় প্রোস্টেট বেড়েছে। 
৫ বছর আগে তার নিজ হাতে গড়ে তোলা মেসার্স জাহানারা অটো রাইচ মিলসটি এখন ধুঁকছে। শুরুতে ৫ কোটি টাকা টাকা ঋণ নিয়েছেন ব্যাংক থেকে। ফ্যাক্টরির ইমারত আর চায়না থেকে মেশিনপত্র আমদানি করতে ঋণের টাকাতো বটেই, লিকুয়িট মানি সব সাবাড়। ফ্যাক্টরি চালাতে গিয়ে ঋণ আর সুদ মিলে দায় দেনা বাড়ছেই। এখন সব মিলে ১৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। 
বজলুর রশিদ হিসেব করেছে, ফ্যাক্টরি না চালালে মাসে ৪০ লাখ টাকা লস হয়। আর ফ্যাক্টরি চালালে মাসে ১০-১২ লাখ টাকা লস গুণতে হয়। একশ কর্মচারির জীবন জীবিকা আর ভবিষ্যতের চিন্তায় ফ্যাক্টরি চালু রাখতে হচ্ছে লস দিয়েই। 
ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত বজলুর রশিদ খেলাধুলা করে ভুড়ির সাইজ কমাবেন-তাও ইচ্ছে করেনা। তার প্রিয় খেলা এখন কাউন ডাউন। ভোটের কতদিন বাকী, দিন গুণে দিন কাবার। 
কবুল করতে কসুর নেই বজলুর রশিদ ব্যবসার খাতিরে আগের রেজিমের নেতাদের সঙ্গে খায় খাতির রেখেছিলেন। পার্টির জনসভায় মোটা অংকের চাঁদাও দিয়েছিলেন। ক্যাডারদের মোটর সাইকেলে পেট্রোল ভরাতে পাম্প রিজার্ভ করেছিলেন। 
৫ আগষ্টের পর অনেকেই তাকে ফ্যাসিস্টের দোসর বলে ফাঁসানোর মতলব আঁেট। বিপদের গন্ধ নাকে আসতেই ক’দিন গা ঢাকা দিয়েও ছিলেন। যদিও পর্দার আড়ালে রফা করে রেহাই পান। এজন্য অবশ্য মোটা অংকের নজরানা গুণতে হয়েছিল। তা না হলে একাধিক মামলার আসামীতো বটেই, জুলাইয়ের হত্যা মামলা- এমনকি বহু পূর্বের ঘটনায় মামলা করে তাকে বেকায়দায় ফেলা বিচিত্র ছিলনা।  নিজ মালিকাধীন ইটভাটা পোড়ানো বন্ধ, ডিসি সাহেবের বুলডোজারে তোপে। রাস্তা মেরামতের ঠিকাদারিও চাঙ্গে, চান্দাবাজদের কুনজরে। আপাতত চাল ব্যবসায়ী হয়ে চামড়া বাঁচানোর তরিকা নিয়েছেন। 
আবার মোবাইল ফোনটি উঠছে। দু’বার বাজার পর বজলুর রশিদ কানে দেন মোবাইল ফোনটি।
-হ্যালো বজলু ভাই। আমার সব শ্যাষ...
কাঁদছেন পরিমল সমাদ্দার। ডাকসাইটে ব্যবসায়ী। গার্মেন্স ফ্যাক্টরি মালিক এ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি। রপ্তানির আয় দিয়ে ফুঁলে ফেঁপে উঠেছিলেন। এখন বহুমুখি চাপ। মার্কিন সরকার শুল্কহার বাড়িয়েছেন, পলিটিক্যাল ডিজ এস্টাবিলিটির কারণে ইউরোপের দেশগুলোও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অর্ডার আসছে কম। তার উপর সুদের হার তাকে দারুণ ভোগাচ্ছে। ব্যাংক ভেদে এখন সুদের হার তেরো-পনের পারসেন। গ্যাস, বিদ্যুৎ, বেতন-ভাতা পরিশোধের চাপতো আছেই। বিজিএমইএ হিসেব দিয়েছে, গত এক বছরে ২৫৮টি রফতানিমুখী  পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে।
-কী হলো দাদা। কাঁনতাছেন ক্যা?  
-আমার ফ্যাক্টরিতে আগুন দিছে হারামজাদারা। সব পুইড়্যা ছাই...
-চিন্তা করবেন না দাদা। ইন্সুরেন্স আছে না? 
-আরে রাখেন আপনার ইন্সুরেন্স?  আমার ব্যবসার গুডউইল নষ্ট হইয়্যা গেল। তার উপর চড়া সুদের হার.. মাথার উপর বিরাট লোড। এহন কী হইবো, বুঝতাছি না ভাই। 
-আপনে শান্ত হন দাদা। সুদ মওকুফের আবেদন কইর‌্যা কিছু কমাইয়া নিয়েন। অনেকেইতো সুদ আসল সব মাফ কইর‌্যা নেয়। আপনিতো মস্ত বড় এফেক্টেট পারসন। 
-যারা নেয়, হেরাতো রাজকপালি। আমিতো মামুলি আদমি। হায় হায় রে..
পরিমল সমাদ্দারের কান্না বিলাপে রুপ নিচ্ছে। 
সুদের হিসাব না মেলায় বজলুর রশিদও কুকড়ে গেছেন। ফ্যাক্টরি বন্ধ করলে কী পরিণতি হবে-ভাবতেই তার প্রেসার মনে হয় উর্দ্ধমূখি হয়ে গেল। মূত্রচাপ সামাল দিতে তিনি ওয়াশরুমে ঢুকলেন। 

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post