ডোমনি মাঝি ।। রবিশঙ্কর মৈত্রী

 



আমি ডোমনি মাঝি--বরিশালের মাইয়া আমি
নারানগঞ্জের গুদারাঘাটে চালাই ইঞ্জিনের নাও।

আন্ধাইরা যাওনের আগেই রোজ
ঘাটে আইয়া খাড়াই।
শীতলক্ষ্যার পানি তখন
ঘুমচোখে ঢেউ তোলে।

চা-ওয়ালার কেটলি ফুটে,
ঘাটের কুকুরডা হাই তোলে,
আর আমি ইঞ্জিনে দড়ি টানি—
ঠ্যাক ঠ্যাক ঠ্যাক খ্যাক খ্যাক কইরা
নাও জাইগা ওঠে।
আমি হাক দিই—
আহেন আহেন, জলদি পার।
উইঠা বন, ছাইড়া যামু অক্ষুনি
ভাড়া আগেই দেন—
ডোমনিরে ফাকি দিয়েন না।

কত কামলা মানুষ ওঠে আমার নাওয়ে
কারও লগে বাজারের ব্যাগ
কারও মাথায় সবজির বোঝা
কারও হাতে অফিসের ব্যাগ
কেউ কেউ ঝাড়া হাত পা।

কেউ চুপচাপ বইসা পড়ে
কেউ খাড়ায়া রঙ্গ দেখে
কেউ কেউ আমারে চোখ দিয়া কামড়ায়।

একদিন সন্ধ্যায় আমার নাওখান ফাকা
কামুক এক বেডায় দাত বাইর কইরা কয়
—এই ডোমনি, খালি কি নাও চালাও
মানুষ চালাও না?
আরেক চ্যাংড়া পোলায় কয়—
তুমি তো সুন্দরী আছিলা
তোমারে দেইখা শীতলক্ষ্যাও লজ্জা পায়!”

আমি তখন ইঞ্জিন বন্ধ কইরা
মাঝগাঙে নাও থামাই।
হাল ছাইড়া, বৈঠাখান হাতে লইয়া কই—
গাঙ্গে চুবানি দিমু?
ওরা ভয় পাইয়া কয়—হইছে হইছে
ত্যাজ আছে ডোমনির
মস্করা বোঝো না?
নাও ছাড়ো, আর কিছু কমু না।

আমি বৈঠাডা ধপাস কইরা
নাওয়ের পাটাতনে মারি।
শীতলক্ষ্যার পানিতে ঢেউ ওঠে।

আমি তো সন্ধ্যা নদীর মাইয়া
প্যাটের দায়ে নাও চালাই দূর দ্যাশে ঘাটে ঘাটে
আমাগো গ্রামে নদী মানে
মায়ের কোলে ঘুমানো।
অচিন মানুষ আমার গতর দেখে
প্যাটের জ্বালা বোঝে না।

আমি ডোমনি মাঝি
বরিশালের মাইয়া আমি।
শীতলক্ষ্যার পানি জানে—
আমি শুধু নাও চালাই না
বদ মাইনষের দাতও ভাঙতে পারি।

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post