অনিকের একমাত্র প্রিয় বন্ধু মিলন। দুজনের বয়স প্রায় তের বছরের মধ্যেই।
এ বছর তারা প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে হাই স্কুলে উঠেছে। ইদানিং স্কুলের নতুন বই পেয়েও তাদের মধ্যে বই পড়ার প্রতি অনিহা দেখা দিয়েছে। অনিক পরিবারের একমাত্র সন্তান। সেকারণে অনিক যখন যা চায়, তার বাবা তা তৎক্ষণাৎ পূরন করেন।
তদুপরি কিছু কিছু চাওয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করে ফেলে।
তখনই পরিবারের মধ্যে কিছুটা অশান্তির সৃষ্টি হয়।
অনিক, ফাইভে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল।
সেকারণে তার বাবা- মা, তাকে অনেকটা বেশি ভালবাসতো। তাকে তেমন শাসন বারণ করতেন না। তাদের আর্থিক অবস্থাও ভাল ছিল।
অনিক, পরীক্ষার পর ছুটির দিন গুলোতে বাবার স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে প্রথমে কার্টুন দেখা শুরু করল।
তারপর বন্ধু মিলনের কাছ থেকে গেম খেলা শিখে খুব পারদর্শী হয়েছে।
এখন দুই বন্ধু চুটিয়ে গেম খেলে।
অনিক এবার বাবার কাছে একটা স্মার্টফোনের বায়না ধরল। সব বন্ধুদের ফোন আছে, আমাকেও একটা ফোন দিতে হবে।
তার বাবা- মা: অনেক বুঝিয়ে বলল, এখন তোমার বয়স কম, এখন লেখাপড়া করার সময়; আর এই অল্প বয়সে ফোন চালালে চোখ নষ্ট হবে, লেখাপড়ার ক্ষতি হবে।
তুমি আগে বড় হও! পরে তোমাকে স্মার্টফোন কিনে দেবো।
অনিক, তার বাবা মায়ের কথায় কিছুতেই সায় দিল না। নাছোড়বান্দা ছেলেটাকে খুশি করতেই; পল্টু সাহেব অগত্যা পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে একটা স্মার্টফোন কিনে আনলেন।
নতুন ফোনটা পেয়ে অনিকের একটা আলাদা আনন্দের অনুভূতির লক্ষণ দেখা গেল।
ইতিমধ্যেই রমজান মাসের ছুটি পড়েছে।
অনিকের স্মার্টফোন দেখতে তাদের বাড়িতে আরো অনেক বন্ধু এল। বন্ধুরা ফোন টি দেখেই, সবাই একটা খুশির অনুভূতি ব্যক্ত করল।
পরদিন থেকে অনিক ও মিলন বাড়ির পিছনের আম গাছের তলায় বসে দু'জনে চুটিয়ে গেম খেলে।
তারা ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করে না, সময়মতো বই পড়ে না।
বাবা মায়ের কোন কথায় কান দেয় না। শাসন বারণ করতে গেলে সুইসাইডের ভয় দেখায়। বাবা মায়ের দুচোখে অশ্রুতে ভরে যায়। একটা মাত্র সন্তান তবুও মানুষের মতো মানুষ করতে পারলেন না।
পল্টু সাহেব, ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। মনে মনে স্থির করলেন, ছেলেকে স্কুলের বোর্ডিংয়ে রাখবেন। কিন্তু অনিক বোর্ডিংয়ে থাকতে রাজি হলো না।
স্কুলের বোর্ডিংয়ে খুব কড়া শাসনে থাকতে হবে।
কোন স্মার্টফোন রাখা যাবে না। সেকারণেই,অনিক বোর্ডিংয়ে যেতে চায় না।
ইতিমধ্যেই পল্টু সাহেব, স্কুলের বোর্ডিংয়ে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
অনিক এ কথা জানতে পেরে রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। বোর্ডিংয়ে যাবার আগের দিন সবারই অগোচরে বাবা মায়ের প্রতি অভিমান করে ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়েছে।
মুহূর্তেই আকাশ বাতাস ভারি করে নেমে এলো একটা বিভীষিকাময় শোকার্ত পরিবেশ।
কী মর্মান্তিক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সম্মুখে দাঁড়িয়ে অনিকের পিতা- মাতা। এক নিমিষেই চুরমার হয়ে গেল, তাদের কত শত স্বপ্ন! এভাবেই এক একটা স্মার্টফোন কেড়ে নিচ্ছে, কত কচিকাঁচা তরতাজা প্রাণ।
অনিক চলে গেছে, তার বাবা মাকে ও সর্বশান্ত করে গেছে।
আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে আজকে একটাই বড় কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ঐ স্মার্টফোন! এর থেকে একমাত্র পরিত্রাণের উপায় শিশুকে ভালবাসা দিয়ে বোঝাতে হবে। হয়তোবা এর চেয়ে আর কোন বিকল্প ওষুধ আজো আবিষ্কার হয়নি।
