কবিতায় প্রণিপাত করেও যে কবি আমাদের কাছে বিস্মৃত প্রায়, কবিতায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েও উপেক্ষার অন্ধকারে রয়ে গেছেন— তাঁকে আমরা ক’জন চিনি? এই প্রজন্ম আজকের দিনে কত সহজে প্রচারের আলোয় আসতে পারছেন, মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, কিন্তু সেই ষাট দশকে তার কিছুই ছিল না। লেটার প্রেসে কবিতা ছাপানোর জন্য পত্রিকার উপরেই নির্ভর করতে হত। সেই সময়েই নিজের পথটি নির্মাণ করা সহজ ছিল না কিন্তু নিজ প্রতিভার গুণেই করতে পেরেছিলেন। তাঁর কবিতার মধ্যেই জেগে উঠেছিল আত্মবিনাশের ছায়া। ইউরোপীয় সাহিত্যে একটি প্রচলিত উক্তি শোনা যায়—
A poet is not a poet unless he has written at least one poem that kills him.
অর্থাৎ একজন কবি কবি নন যদি না তিনি অন্তত একটি কবিতা লেখেন যা তাঁকে হত্যা করে। কথাটি আমেরিকান কবি এবং বিট প্রজন্মের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব অ্যালেন গিন্সবার্গের নামে উত্থাপিত হয়। এটিতে এই ধারণাই প্রতিফলিত করে যে, সত্যিকারের কবিতার জন্য দুর্বলতা, তীব্রতা এবং নিজের গভীরতার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা প্রয়োজন। এই কবি সেই ক্ষরণ, ভাঙন, তাপন, জ্বলন, মন্থন, দহন ও জীবন নিয়ে কবিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাই তাঁকে আজও আলাদা করে চিনতে পাঠকের অসুবিধা হয় না।
কবিতায় সেই প্রথম শহিদের নাম শামশের আনোয়ার (১৯৪৪-১৯৯৩)। ষাটের দশকের অন্যতম কবি হিসেবেই উল্লিখিত হলেও তিনি অবহেলিত একজন কবিও সে কথা বলাই বাহুল্য। প্রচলিত রীতি অনুসরণ না করেই তিনি কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দ দাশের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে । মাত্র তিনখানি কাব্যগ্রন্থ নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিলেন: ‘মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে’ (১৯৭৩), ‘মূর্খ স্বপ্নের গান’(১৯৭৬) এবং ‘শিকল আমার গায়ের গন্ধে’ (১৯৮৯)। কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন বহু কবিতাও তাঁর ছড়িয়ে আছে। যে সময় তরুণ যুবকদের কবিতা নেশাগ্রস্ত করে তুলেছিল, সেই সময়েই শামশের আনোয়ারের আবির্ভাব ঘটে। সুব্রত চক্রবর্তী, ভাস্কর চক্রবর্তী, উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার এবং পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী এবং শঙ্খ ঘোষদেরও এই দলে সামিল হতে দেখা যায়। প্রথম আবির্ভাবেই শামসের চিহ্নিত হয়ে গেলেন অকপট স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা লিখে। উত্তাল তরঙ্গ, অনপনেয় দীর্ঘশ্বাস, তীব্র আর্তনাদ, রোমহর্ষক যৌনতা এবং চাপা কান্নার ভেতর তাঁর নিরালম্ব অসহায়তাকে কবিতা করে তুললেন। সবাই জেনে গেল রুদ্র বসন্তের অমাবস্যার গান কেমন ভাবে তিনি গাইলেন। যে বিষণ্ণতা খুবলে খুবলে তছনছ করে দেয় আমাদের সেই বিষণ্ণতা যে গর্জনও করতে পারে সেই ধ্রুব নিঃসঙ্গতাই অবধারিত হয়ে উঠল। ভাস্কর চক্রবর্তীকে একটা চিঠিতে লিখলেন “আমরা প্রত্যেকেই নিঃসঙ্গ। এত বেশি নিঃসঙ্গ লোকদের মধ্যে ঠিক সাধারণ অর্থে, বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে না। তবে কালা, বোবা কি অন্ধ মানুষদের ভিতর যেরকম বন্ধুত্ব থাকে— হয়তো সেরকম একটা কিছু আছে।” অশ্রু সাগরে যেন এক একটা দ্বীপের মতোই জীবনকে তিনি দেখতে পেলেন। ছোটবেলা থেকেই যে বৈভব-প্রাচুর্যে তিনি মানুষ হয়েছেন, একসময় তা ধূসর হতে শুরু করেছে। আস্থাবর অস্থাবর সম্পদগুলিও ধীরে ধীরে নিঃশেষের পথে, তাই জীবনেও স্থিতি আসেনি। মুর্শিদাবাদ থেকে জলপাইগুড়ির চা বাগান, কলকাতা শহরের পার্ক সার্কাস রো কোথাও তাঁকে স্থিতি দিতে পারেনি। পিতা-মাতার বিচ্ছেদ তাঁর জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। যে নানি তাঁকে স্নেহে ভালোবাসায় আশ্রয় দিয়েছে সেও যখন মৃত্যুর ডাকে চলে গেছে, তখন কবি হয়েছেন আরো নিঃসঙ্গ, মর্মান্তিক সেই শূন্যতা ভুলতে পারেননি। নাজনিন নামে এক নারীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেও সংসারে প্রবেশ করে অনটনে পড়েছেন। পরিবারের কাছে যেমন দায়বদ্ধ হতে পারেননি তেমনি সংসার পরিচালনায়ও তৎপর হতে পারেননি। এক মানসিক অসুস্থতায় তলিয়ে গেছেন। সেই সময় থেকেই এক আকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে তিনি লালন করতে থাকেন। ১৯৯২ সালের অক্টোবর মাসে জমিয়ে রাখা প্রায় শ-দেড়েক ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেন। তারপর পাঁচ মাস কোমায় আচ্ছন্ন থেকে এস. এস. কে. এম হাসপাতালের বেডে ১৯৯৩ এর ১২ই জুন জীবনের সব লেনদেন চুকিয়ে দেন।
শামশের আনোয়ার এমনই অতল অবসাদে ডুবে গেছিলেন যে, নিজের ওপরেই আর সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। তাই একসময় তাঁর যাবতীয় সংগ্রহ কবিতা ও কাব্য তিনি বিসর্জন দিতে চেয়েছিলেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একথাই জানিয়ে লিখেছেন “আমাদের সবার কবিতার বই ও ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মাটিতে, নিজের কবিতার বই তো বটেই। অসম্ভব উত্তেজনায় কাঁপছিল শামসের বলছিল কলকাতা ছেড়ে চলে যাবে অনেক দূরে।” কিন্তু শুধু কলকাতা নয়, ইহজগৎ ছেড়েই যাবার বড় পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
তাঁর জীবনের মতোই কবিতায় ভাষা ব্যবহারেও শামশের ছিল বেপরোয়া। বাঘের বাকপ্রতিমা থেকে বিপন্ন পৌরুষের হাহাকারই তাঁর কবিতায় বারবার উঠে এসেছে। তৎকালীন নানা সামাজিক আন্দোলনেও তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেননি। নিজস্ব আত্মিকসংকটের মধ্যেই তাঁর অস্তিত্বের অন্বেষণ করেছেন। আত্মধ্বংসের পথেই আত্মস্বরের প্রবাহে নিজেকে প্রবাহিত করেছেন। প্রথম কাব্য ‘মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে’-এর একটি কবিতা ‘এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা’-তে জীবনানন্দ দাশের বিপরীতে দাঁড়িয়েই ঘোষণা করেছেন:
“কোনো বিদর্ভ নগরী আমার স্বপ্নের ভিতর জেগে ওঠে না
ইতিহাসে কোনো অর্থ নেই মূঢ়তা ও ভ্রান্তি ছাড়া
যে নারী আমাকে পথে বসালো তার ক্রূর হাসির ছাপ
লেগে আছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়
আমি জানি মানুষের কোনো উত্তরণ ক্লিওর আঁচলে বাঁধা নেই
এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা ছেড়ে কোনো সত্যের
অপেক্ষা আমি রাখি না”
এই নিঃসঙ্গ বিছানাতেই তিনি নিজেকে শায়িত করেছেন। তাই কোথাও হৃদয় খুঁজে পাননি। কলকাতার কল্লোলিনী তিলোত্তমার রূপও তাঁর চোখে ধরা পড়েনি। এক অস্বস্তিকর ও ক্রোধ বারবার জেগে উঠেছে তাঁর কবিতাতে। আমরা শান্ত মোলায়েম এক প্রসন্নতার যে আকাশ কবিতায় খুঁজেছি তা সেখানে একেবারেই অনুপস্থিত। এক আদিম প্রবাহ থেকে রুক্ষ জীবনের মর্মান্তিক রূপ ধরা পড়ে যা গ্লানি আর সীমাহীন অমার্জিত রূপেরই সমাহার :
“বাঘে যেমন চাটে হরিণের রক্ত, আমি বারংবার, সেভাবে তোমার অশ্রু চেটে খাই
চাটি নক্ষত্রের পুঁজ, ফুলের শ্বেতী, ব্যাপ্ত ও রসালো ফাংগাস
চেটে খাই সূর্যের লোল, উদ্ভাসিত কুষ্ঠ
সমুদ্রের উপর ছড়িয়ে থাকা ভাঙা নীল বিষের টুকরো
ঝড় ও বিদ্যুতের জিভ দিয়ে চাটি মৃত,
প্রাকৃতিক খরগোশের ঘাড়
চাটি মায়ের অভিশাপ, বন্ধুদের কুৎসা এবং শুকনো প্রতিজ্ঞার হাড়
আর চাটি, ক্রমাগত পাগল হয়ে চাটি, মৃত কবিতার স্তন
মৃত কবিতার যোনি।”
সুতরাং যে কল্পনার জগৎ, যে সর্বমালিন্য হরণকারী স্বপ্নের নির্মাণ এখানে আমরা খুঁজে পাই না। সুতরাং মনন জগতেও শামশেরের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। যদিও ব্যক্তিজীবনে বাইরে তাঁর কোনো কবিত্বের বিজ্ঞাপন ছিল না। চুল-দাড়িওয়ালা পাঞ্জাবি পরিহিত তিনি তথাকথিত ব্যান্ডের কবিও হতে চাননি। অস্তিত্ববাদেরও কোনো পরিচয় তিনি দিয়ে যাননি। সর্বোপরি সব ধরনের কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে এক মানবিক চেতনায় তিনি লালিত হতে চাইতেন। প্রেম আর স্মৃতি সিগারেটের ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিয়ে অবক্ষয়ের উলঙ্গ সঙ্গম দেখে তিনি নিজের কাছেই ফিরে এসেছেন সেই নিঃসঙ্গ বিছানায় :
“যে সৃষ্টি আর সভ্যতা আমার বুকের বাইরে গ’ড়ে উঠেছে
তার প্রতি আমার বুকের কোনো মায়া নেই
কলকাতা আর আমার এই নিঃসঙ্গ বিছানা ছাড়া কোনো সত্যের
অপেক্ষা আমি রাখি না।”
ধ্বংস ও যন্ত্রণা এবং অন্ধকারের অভিঘাত কিছুতেই তিনি এড়িয়ে যেতে পারেননি। তাই খ্যাতি, বৈভব, সন্তান বাৎসল্য, বিবাহিত জীবনের স্বাদ কিছুই তাঁকে আটকাতে পারেনি। তাই আত্মহত্যাপ্রবণ ঘোর বারবার জেগে উঠেছে, তখন লিখেছেন :
“খোলা ব্লেড দেখলে তৃষ্ণায় আমার গলা জ্বলে
পাখার হুক দেখলে মনে প’ড়ে যায় সোনালি ফাঁসের কথা”
(এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা)
“হতাশার লোমে ভর্তি, কদাকার হাত
আমার গলা চেপে ধরে”
(জীর্ণ ছবি)
“আজ আমি খুরপি নিয়ে শুয়েছি
কোপাবো নিজেকে”
(পৌরাণিক )
এই মৃত্যুর ডাক শুনতে শুনতেই তিনি পেলবতার আর দেখা পাননি। ‘কী শীত আর কী বসন্ত’ বাইরে কেঁপে উঠলেও ভেতরে আগুন জ্বলে। আবার গ্রীষ্মের দাহ উত্তাপ ছড়ায় না ভেতরে ভেতরে শীতে কাঁপায়। যে কোদালখানায় কবর খোঁড়া হবে তা তিনি নিজের শিয়রে রাখেন। চিত্রকল্পগুলি বিপরীতমুখী হয়ে ভেঙে যেতে থাকে। সেই কবিই তো লিখতে পারেন আক্রোশে পাথর চিবানোর কথা, জ্যোৎস্না চিবানোর কথা। সেই কবিই তো দেখতে পারেন অজন্তার পাথরে মাটি ও মলের বিপ্লব। সেই কবিরই তো দিনগুলো কেটে যায় প্রবল পাপ-চিন্তায়। প্রকৃত একজন তস্কর ছাড়া প্রকৃত দরজা কেউ খুলতে পারে না। বাঙালি যে কবিতা পাঠে অভ্যস্ত ছিলেন না, সেই কবিতাই তিনি লিখে গেছেন তাই তা চিরদিন অস্বস্তিকর হয়েই রয়ে গেছে।
