শ্রাবণের মেঘদূত ।। দিব্যেন্দু ঘোষ


কলকাতার বুকে বর্ষা আসে তার নিজস্ব দাম্ভিকতা নিয়ে। গঙ্গার ওপার থেকে ধেয়ে আসা কালো মেঘ যখন হাওড়া ব্রিজের ইস্পাতের কাঠামোকে ঢেকে দিয়ে শহরের বুকে আছড়ে পড়ে, তখন শহরের সমস্ত হিসেবনিকেশ কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায়। বাংলায় হিসেবের খাতায় বর্ষা দু’মাস হলেও ব্যাপ্তি প্রায় চার মাস। কিন্তু ইরার জীবনে বর্ষা এসেছিল অসামাজিক এক প্রলয় হয়ে।
শহরের এক অভিজাত কংক্রিটের দেওয়ালের মাঝে ইরার সংসার। স্বামী সোমনাথ সান্যাল শহরের নামজাদা কর্পোরেট উকিল। বাইরের পৃথিবীর চোখে ইরার জীবন সোনার ফ্রেমে বাঁধানো এক নিখুঁত চিত্রকর্ম। উইকেন্ড পার্টি, নামীদামি ক্লাবের মেম্বারশিপ আর ডিজাইনার পোশাকে মোড়া ইরার ছবি পেজ-থ্রির পাতায় প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু এই সামাজিকতার ফ্রেমের আড়ালে রোজ রাতে একটি নারী ধর্ষিত হয় বিবাহিতের লাইসেন্স নিয়ে। সোমনাথের কাছে ইরা তার স্ট্যাটাস সিম্বল। রাতের অন্ধকারে সেই স্ট্যাটাস সিম্বলের শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে নিজের পৌরুষ প্রমাণ করাই সোমনাথের একমাত্র বিনোদন। সেখানে ভালবাসা নেই, আছে শুধু অধিকারবোধের নামে একতরফা পাশবিকতা।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ছাঁট কাচের জানলায় আছড়ে পড়ে তৈরি করছে অসংখ্য জলছবি। ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই বর্ষা তাকে যেন আরও বেশি একাকী করে তোলে। তার বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাগুলো বাইরের বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নামতে চায়, কিন্তু সামাজিকতার ভয়ে তাকে আটকে রাখতে হয় চোখের কোণেই। বর্ষা হাসাতে পারে, কাঁদাতে পারে। বর্ষা ভাবায়, বর্ষা ভালবাসায়। কিন্তু ইরার মনের ভেতরকার শ্রাবণ যেন স্তব্ধ হয়ে ছিল গত পাঁচটা বছর। অন্যদিকে, শহরতলির এক ভাঙাচোরা স্টুডিয়োতে মাটি, পাথর আর ক্যানভাস নিয়ে একাকী জীবন কাটায় অর্কপ্রভ। সমাজ তাকে বলে বাউন্ডুলে, অসামাজিক। বছর তিনেক আগে এক নারী পাচারকারীকে খুন করার দায়ে জেল খেটেছে সে। আইনের চোখে সে অপরাধী, সমাজের চোখে ব্রাত্য।
অর্কপ্রভর সঙ্গে ইরার আলাপটা অপ্রত্যাশিতই। গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় আর্ট এগজিবিশন। সোমনাথের অহঙ্কার প্রদর্শনের জন্য ইরাকে পাঠানো হয়েছিল একটি ভাস্কর্য কিনতে। সেখানে অর্কপ্রভর হাতে তৈরি একটি মাটির মূর্তির সামনে থমকে দাঁড়িয়েছিল ইরা। মূর্তির নাম ‘মেঘদূত’।
-আপনার যক্ষ তো মেঘকে খুঁজছে না, সে যেন মেঘের সঙ্গে নিজেই মিশে যেতে চাইছে।
ইরার কথায় অর্কপ্রভ চোখ তুলে তাকায়। একমাথা উস্কোখুস্কো চুল, পরনে রং-লাগা জিন্স, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, ধারালো।
-যক্ষ যখন জানে প্রিয়া দূরবর্তী, তখন সে নিজেই মেঘ হয়ে প্রিয়ার কাছে ঝরে পড়তে চায়। কিন্তু সমাজের চোখে তো মেঘের এই অঝোর ধারা কেবলই উপদ্রব।
সেই শুরু। একটু একটু করে গোপন এক গল্পের নির্মাণ হতে থাকে। ইরা মাঝে মাঝেই আসতে শুরু করে অর্কপ্রভর স্টুডিয়োয়। সোমনাথ যখন দিনের পর দিন ক্লাবে মদ ওড়াত, ইরা লুকিয়ে চলে যেত কুমোরটুলির ওই পুরনো বাড়ির চিলেকোঠায়। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, ঘরে ছড়ানো ক্যানভাস, তিসির তেল আর ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধে ইরা যেন এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান পেল।
-তুমি জানো অর্ক, মধ্যযুগের কবিরা বর্ষাকে অভিসার ও বিরহ পর্বে ‘প্রেমের আগুনে ঘিয়ের ছিটে’ হিসেবে কল্পনা করেছেন?
একদিন দুপুরে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ইরা বলে। তার পরনের নীল শাড়ি বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে। মাটির তালে হাত চালাতে চালাতে অর্কপ্রভ হাসল।
-আর আধুনিক যুগে? মাইকেল মধুসূদন দত্ত তো বলেছিলেন মেঘের গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে নারী-বক্ষে উন্মাতাল ঢেউ ওঠে। সমাজ তো সেই ঢেউকে ভয় পায় ইরা।
-সমাজ!
ইরা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে।
-সমাজ মানে সোমনাথের মতো পুরুষদের অহঙ্কার। জানো, কাল রাতেও আমার পিঠে বেল্টের দাগ বসেছে? কারণ আমি পার্টিতে হাসতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, এই তথাকথিত সমাজ একটা বিশাল বড় পতিতালয়। কেউ টাকার বিনিময়ে, কেউ ক্ষমতার বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। আমি বিক্রি হয়েছি সম্মানিত গৃহবধূর তকমা পাওয়ার জন্য। এই সামাজিকতার চেয়ে তো তোমার অসামাজিক মাটি অনেক বেশি খাঁটি।
অর্কপ্রভ উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে ইরার দিকে।
-সমাজ মানুষকে শুধু অভিনয় করতে শেখায় ইরা। তুমি যেদিন নিজের ভেতরের পশুটাকে, নিজের আদিম সত্তাকে স্বীকার করতে পারবে, সেদিন এই সামাজিকতার কোনও মূল্য থাকবে না তোমার কাছে।
সেদিন সকাল থেকে আকাশ কালো করে একটানা বৃষ্টি। শহরের রাস্তাঘাট জলমগ্ন। সোমনাথ দিল্লিতে একটা কনফারেন্সে। ইরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ছাতা ছাড়াই বেরিয়ে পড়ল সে। ভিজে জবজবে হয়ে যখন সে অর্কপ্রভর চিলেকোঠার দরজায় ধাক্কা দিল, তখন তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে বৃষ্টির জল, আর মনের প্রতিটা কোণে বিদ্রোহের আগুন। অর্কপ্রভ দরজা খুলেই চমকে উঠল। ইরার শাড়ি ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে। তার ভেজা চুল থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত আদিমতা।
-আমি তোমার কাছে মেঘ হতে চাই অর্ক, যে মেঘ সব ক্ষত ধুয়ে দেবে, আজ আমি কোনও নিয়ম মানতে চাই না। আজ আমি শুধু তোমার হতে চাই, সম্পূর্ণ অসামাজিকভাবে।
মেঘের গর্জনে নদ-নদী উথাল-পাথাল হয়ে ওঠে বাইরে, আর ভেতরে ভাঙে বহু বছরের জমানো বাঁধ। অর্কপ্রভ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার রুক্ষ, কাদামাখা হাত ছুঁয়ে যায় ইরার ভেজা গাল। ইরার চোখ বুজে আসে। সে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে অর্কপ্রভকে। তাদের ঠোঁট যখন প্রথমবার মিলিত হল, বাইরে তখন প্রবল বজ্রপাত। দীর্ঘ পাঁচ বছরের জমে থাকা কান্না, অভিমান আর কামনার বিস্ফোরণ ঘটে সেই দীর্ঘ, গভীর চুম্বনে। নিখাদ প্রেমের এই চুম্বনে মিশে থাকে বিদ্রোহ। ইরার ভিজে শাড়ি খসে পড়ল মেঝের উপর, খসে পড়ল সামাজিকতার শেষ আবরণ। কর্মহীন অলস সময়ের আড়ালে তারা মেতে উঠল স্বর্গীয় মিলনে, যাকে সমাজ হয়ত বলবে জৈবিক চাহিদা নিবৃত্তির উৎসব, কিন্তু তাদের কাছে তা ছিল আত্মার মুক্তি। শীতল বৃষ্টির দিনে দুটো উত্তপ্ত শরীর একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। অর্কপ্রভর প্রতিটা স্পর্শে, প্রতিটা আদরে বর্ষা তাদের ভিজিয়ে দেয়। সোমনাথের দেওয়া সমস্ত কালশিটে, সমস্ত মানসিক যাতনা অর্কপ্রভর ঠোঁটের ছোঁয়ায় ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছিল। একে অপরের শরীরে তারা খুঁজে নেয় প্রশান্তি। অর্কপ্রভর সুবিশাল বক্ষে আছড়ে পড়ে ইরার সব ক্লান্তি। কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম বড় নির্মম। লুকিয়ে রাখা সত্য একদিন ঠিকই বেরিয়ে আসে। সোমনাথের কাছে খবর পৌঁছতে দেরি হল না।
মাস দুয়েক পরের কথা। সেদিনও আকাশ মেঘলা। ইরা অর্কপ্রভর স্টুডিয়োতেই ছিল। হঠাৎ দরজায় প্রবল ধাক্কা। অর্কপ্রভ দরজা খুলে দিল। সামনেই সোমনাথ দাঁড়িয়ে, তার পেছনে দুজন পুলিশের লোক এবং আরও কয়েকটা ছেলে, যাদের দেখলে ঠিক সুস্থ স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। সোমনাথের চোখদুটো জ্বলছে। ছেলেগুলো মুহূর্তের মধ্যে ভাঙচুর শুরু করল অর্কপ্রভর স্টুডিয়ো। ধুলোয় মিশে গেল সব ভাস্কর্য।
-একটা রাস্তার কুকুরের সঙ্গে, একটা অশিক্ষিত পেন্টারের সঙ্গে শুতে তোর রুচিতে বাঁধল না? এই তোর বংশমর্যাদা?
সোমনাথের গর্জন মেঘকেও হার মানায়।
-তুই আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিলি?
ইরা শান্তভাবে নিজের শাড়িটা ঠিক করে সোমনাথের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে প্রতিবাদের আগুন।
-সম্মান? রুচি? তোমার আবার সম্মান কীসের সোমনাথ? দিনের বেলা কোর্টে দাঁড়িয়ে সমাজের সামনে সতী সেজে থাকা আর রাতে বন্ধ দরজার ওপাশে নিজের স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে জোর করে ভোগ করার নাম, তাকে ধর্ষণ করার নাম যদি সামাজিকতা হয়, তবে আমি বেশ্যা হতে রাজি! অন্তত সেখানে জোর জবরদস্তি নেই, সম্মতি আছে।
-চুপ কর রেন্ডি! তুই জানিস এর ফল কী হবে? আমি তোকে রাস্তায় নামাব। আর এই শুয়োরের বাচ্চাটাকে জেলের ঘানি টানাব।
রক্তাক্ত মুখে এগিয়ে এসে, শান্ত গলায় হেসে উঠে অর্কপ্রভ বলল,
-সমাজ! যে সমাজ তোমার মতো একজন খুনি আর ধর্ষককে বিশিষ্ট নাগরিক বলে মাথায় তুলে নাচে, আর ভালবাসাকে বলে পাপ, সেই সমাজকে আমরা ভয় পাই না মিস্টার সান্যাল। তুমি ক্ষমতা আর টাকার জোরে শরীর কিনতে পারো, কিন্তু সম্মতি আর ভালবাসা কিনতে পারো না। ইরাকে তুমি আর কোনওদিন ছুঁতে পারবে না।
সোমনাথ পুলিশের দিকে ইশারা করল।
-অ্যারেস্ট দিস বাস্টার্ড! চার্জ হবে আমার বউকে ব্ল্যাকমেইল করার। তুই জেলে পচে মরবি খানকির ছেলে।
পুলিশ এগিয়ে আসতেই ইরা হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সোমনাথ।
-ব্ল্যাকমেইল অর্ক করেনি সোমনাথ, করেছি আমি।
ইরা সোমনাথের দিকে এক পা এগিয়ে গেল।
-তুমি কী ভেবেছিলে, আমি শুধু শুধু এই ভাঙাবাড়িতে আসতাম প্রেমের জন্য? তোমার ল্যাপটপে থাকা তোমার ক্লায়েন্টদের সমস্ত ব্ল্যাক মানি, ফেক কোম্পানির ডেটা এবং নারী পাচার চক্রের সঙ্গে তোমার যোগাযোগের প্রমাণ গত তিন মাস ধরে আমি একটু একটু করে কপি করেছি।
সোমনাথের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ইরা পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করল।
-অর্ক শুধু একজন শিল্পী নয় সোমনাথ। ও একজন ফ্রিল্যান্স ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট, যে তিন বছর আগে তোমারই পাঠানো এক নারী পাচারকারীকে খুন করে জেল খেটেছিল। তোমার ওই বিশাল সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই পেনড্রাইভটাই যথেষ্ট। আর এই যে পুলিশ অফিসাররা তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে...
অর্কপ্রভ হাসল।
-ওরা তোমার লোক নয় সোমনাথ। ওরা ইকনমিক অফেন্স উইংয়ের অফিসার। আমিই ওদের এখানে ডেকেছি।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসাররা এবার সোমনাথের দিকে ঘুরল।
-মিস্টার সোমনাথ সান্যাল, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট ফর মানি লন্ডারিং, কর্পোরেট ফ্রড অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং।
এক মুহূর্তে সোমনাথের সাজানো সামাজিক অহঙ্কার, দম্ভ সবকিছু তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। হাতকড়া পরিয়ে নীচে নামানোর সময় একবার ইরার দিকে তাকাল সোমনাথ।
-তুই আমাকে ফাঁসালি ইরা? তুই আমাকে ভালবাসিসনি কোনওদিন?
ইরা শান্ত গলায় জবাব দিল,
-ভালবাসা তো তুমি শিখিয়েছ সোমনাথ, হিসেব করে, চুক্তি করে। আমি শুধু তোমার খেলাটা তোমার সঙ্গেই খেললাম। তবে হ্যাঁ, একটা পার্থক্য আছে। তুমি আমাকে ব্যবহার করেছিলে তোমার শরীরের খিদে মেটানোর জন্য। আর আমি তোমাকে ব্যবহার করলাম আমার মুক্তির জন্য।
সোমনাথকে নিয়ে পুলিশ চলে যাওয়ার পর চিলেকোঠার ঘরটা আবার শান্ত হয়ে গেল। বাইরে আবার মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। টানা সাত দিন ধরে বৃষ্টি চলছে শহরে। হাওড়া ও তার আশপাশের এলাকা জলে ভাসছে। ওই রাতেই, ওই দুর্যোগের মধ্যেই একটা ছোট পালতোলা নৌকায় এসে উঠল অর্কপ্রভ আর ইরা।
-কোথায় যাব আমরা?
-যেখানে এই সমাজ আমাদের ছুঁতে পারবে না।
তারা যখন মাঝনদীতে, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, খরতর বক্রহাসি শূন্যে বরষিয়া। অর্কপ্রভ ইরার ঠোঁটে শেষবারের মতো একটা গাঢ় চুম্বন এঁকে দেয়। তারপর তারা দুজনে নৌকা ছেড়ে ঝাঁপ দেয় গর্জে ওঠা নদীর অথৈ জলে। ডুবসাঁতারের খেলার মতো পানকৌড়ির ডুব দিয়ে তারা ঠিক পৌঁছে যায় অন্য এক তীরে, যেখানে রাখা ছিল তাদের নতুন জীবনের চাবিকাঠি।
বহু দূরে, অন্য এক শহরে, অন্য পরিচয়ে, নাগরিক কোলাহল থেকে দূরে, এক পাহাড়ি গ্রামের ছোট্ট কাঠের বাড়িতে বসে ইরা উলের নকশিকাঁথা সেলাই করছে। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। ঘরের ভেতর উনুনের গনগনে আঁচ। অর্কপ্রভ এক কাপ গরম চা হাতে এসে দাঁড়ায় ইরার পাশে।
-তুমি ঠিকই বলেছিলে অর্ক,
ইরা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,
-কখনও কখনও মরতে হয়, নতুন করে বাঁচার জন্য। সমাজের চোখে আমার পুরনো রূপ মৃত, কিন্তু আমার ভেতরে আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন। বাস্তব বড়ই কঠিন। সেখানে ভালবাসা দিয়ে সব জয় করা যায় না, মাঝে মাঝে একটু অসামাজিক হতে হয়, একটু নোংরা ঘাঁটতে হয়।
অর্কপ্রভ ইরার ঘাড়ে আলতো করে একটা চুমু খায়।
-বর্ষার জল তো সব নোংরা ধুয়েই দেয় ইরা। আর আমি তোমার সেই মেঘদূত, যে নির্বাসন থেকে ফিরে এসেছে কেবল তোমার জন্যই।
ওরা জানে, এই নিখাদ প্রেম, এই শরীরী আর আত্মিক উদযাপন সমাজের তৈরি করা কোনও সংজ্ঞায় বাঁধা পড়ে না। প্রকৃতির খাতায় এই অসামাজিক প্রেমই হবে শ্রেষ্ঠ কবিতা। 

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post