বর্ষার রাতে পিশাচিনী ।। চন্দ্রানী মজুমদার

 



সেদিন রাতে ছাত্র পড়িয়ে গ্রামের মাস্টার মশাই বাড়ি ফিরছিলেন। সময়টা বর্ষাকাল, সেই রাতে খুব বর্ষা হচ্ছিল, তাই রাস্তাঘাট নির্জন। এর মধ্যে ছাতা মাথায় দিয়ে মাস্টার মশাই হেঁটে চলেছেন। মাঝ পথে এক মহিলার কান্নার আওয়াজ শুনে মাস্টার মশাই দাঁড়িয়ে গেলেন। যে রাস্তা দিয়ে উনি হেঁটে যাচ্ছিলেন, তার পাশেই একটা গভীর অরণ্য। এই অরণ্যের ভিতর থেকে কারোর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। খুব কৌতূহল বশত মাস্টার মশাই সেই অরণ্যে প্রবেশ করলেন এবং দেখলেন কোনো মহিলা ঘোমটার আড়ালে একটা গাছের নিচে বসে কাঁদছে। মাস্টার মশাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন - "আপনি কাঁদছেন কেন? কোথায় বাড়ি আপনার?" মহিলাটি ঘোমটা না তুলেই উত্তর দিলো - "এই অরণ্যের পাশেই আমার বাড়ি। আমার স্বামী খুব মদ খায় এবং আমাকে মারধোর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, তাই এখানে বসে কাঁদছি"। মাস্টার মশাই জিজ্ঞেস করলেন - "নাম কি আপনার? এই বর্ষায় এভাবে ভিজবেন না, আমার ছাতার তলায় আসুন। আপনার যদি আপত্তি না থাকে আপনাকে আজ রাতে আমার বাড়িতে আশ্রয় দিতে পারি"। মহিলাটি ঘোমটার আড়াল থেকে জানালো - "তার নাম কুহেলিকা এবং মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি যেতে তার কোনো আপত্তি নেই"। এরপর দুই জন ছাতা মাথায় দিয়ে এই বর্ষার রাতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের বাড়িতে পৌঁছালো। মাস্টার মশাইয়ের বাড়িতে কেউ নেই, চাকরি সূত্রে উনি এই বাড়িতে একাই থাকেন। তাই মহিলাকে নিয়ে এই রাতে কেউ প্রশ্ন করার মতন মানুষও ছিলনা। নিজের ঘরে বসতে বলে আলমারি থেকে একটা পোশাক বের করে আনলেন এবং কুহেলিকা কে ড্রেস চেঞ্জ করে নিতে বললেন।

এরপর মাস্টার মশাই সেই ঘর থেকে বেরিয়ে কিচেনে গেলেন এবং রাতের রান্না তৈরী করতে লাগলেন। সেটা তৈরী হতেই উনি কুহেলিকা কে খাওয়ার জন্য ডাকতে গেলেন। কিন্তু তাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখে মাস্টার মশাইয়ের হুস উড়ে গেল। তিনি দেখলেন কুহেলিকা ঘোমটা খুলে ফেলছে এবং তার মুখ থেকে লম্বা দাঁত বেরিয়ে এসেছে। ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাংস বের করে সে চিবিয়ে খাচ্ছে, তার দাঁতে মুখে রক্ত লেগে আছে। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে মাস্টার মশাই অজ্ঞান হতে বসলেন। এই বর্ষার রাতে কোন পিশাচিনী কে তিনি নিজের ঘরে নিয়ে এসেছেন। এখন নিজের ঘর থেকে নিজেই পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাই মাস্টার মশাই পালাতে উদ্যত হলেন, কিন্তু কুহেলিকা ডেকে জানায় - "আমি আপনার কোনো ক্ষতি করবো না, আপনার বাড়িতে এসেছি অনেকদিন অভুক্ত ছিলাম বলে। যারা আমার উপকার করে তাদের আমি কখনো ক্ষতি করিনা। আপনি থাকুন নিজের বাড়িতে, আমি এখনই চলে যাচ্ছি অরণ্যে"। - এই বলে কুহেলিকা অদৃশ্য হয়ে গেল এবং মাস্টার মশাই তার হাত থেকে মুক্তি পেলেন। তবে সেই বর্ষার রাতের ঘটনা মাস্টার মশাই কোনোদিন ভোলেন নি। এমনকি কাউকে এই ঘটনা খুলে বলতেও পারেন নি। পাছে কেউ বিশ্বাস না করে তাই নিজের স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন সবটা। আজও কোনো বর্ষার রাতে উনি সেই অরণ্যের পাশ থেকে হেঁটে যেতে ভয় পান। তাই বেশি রাত হলেই রাস্তা চেঞ্জ করে অন্য পথ দিয়ে বাড়ি ফেরেন।

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post