টুকায়ের ডিভোর্সটা শেষমেশ ঠেকানো গেল না। অমন সুন্দর সুপুরুষ ছেলে খুব কমই দেখা যায়। শিক্ষিত, বনেদি পরিবারের ছেলে, কোনও ত্রুটিই তার ছিল না, তবু। চাকরি নিয়ে দিল্লি গেলে অফিসেরই এক পাঞ্জাবি মেয়ের সঙ্গে আলাপ ও প্রেম হয় তার। ছেলের পছন্দ তাই বাবা-মা কোনও আপত্তি করেননি। দুইবাড়ির মতে ওদের বিয়ের ঠিক হয়। মায়ের কেবল মনে খুঁতখুঁতানি বাঙালি মতে বিয়ে হবে না বলে। তাই দিল্লিতে পাঞ্জাবি মতে বিয়ে হবার পর কলকাতায় এলে পরদিন আবার তাদের বাঙালি মতে বিয়ে দিয়ে তবে মায়ের শান্তি। বিশাল ধুমধাম করে বিয়ে হলো, ফুলশয্যা হলো। শ্বশুরবাড়িতে সে বউ প্রথম থেকেই নিজের দাপটে। সে যা খাবে তাই তাকে খেতে দিতে হবে এবং তা রীতিমত অর্ডার করে। আর সারাদিন চলে তার রূপচর্চা, দেহচর্চা। মা প্রমাদ গোণেন, তবে মুখে কিছু বলেন না। নতুন বিয়ে হয়েছে, বউ যা করে টুকাই তাতেই খুশি হয়। মা ভাবেন ওরা খুশি থাকলেই হল। ওরা অন্য জায়গায় থাকবে, থাকুক নিজেদের মতো।
কিন্তু কালে দিনে টুকাই প্রমাদ গোনে। পাঞ্জাবি বউয়ের শুধু টাকার চাহিদা, সংসারে মন নেই তার বিন্দুমাত্র। কেবল ঘুরবো, বেড়াব, শো-অফ করব। জন্মদিনে টুকাই কুড়িলাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনে দিলো বউকে। নিজে গাড়ি চালাতে জানে না, ইচ্ছাও নেই। বউ সোনিয়াই গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কখনও টুকাই থাকে সঙ্গে কখনও একাই বন্ধুদের বাড়ি, সিনেমা, রেস্টুরেন্ট, হৈহুল্লোড় করে ঘুরে বেড়ায়। এরপর বিবাহবার্ষিকীতে টুকাই দু'লাখ টাকা দিয়ে এক হীরের আংটি কিনে দিল। বাবা-মা শুনে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেন, "এ ছেলে পরে সামাল দেবে কী করে!" সত্যিই তাই, চাকরির টাকায় টুকাই বউয়ের চাহিদা মেটাতে সমর্থ হচ্ছিল না। তাই চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করল সে। ব্যবসায় শুরুতে একটু হিসাব করে চলতে হচ্ছিল। এই নিয়েই অশান্তির সূত্রপাত। হঠাৎ হঠাৎ কোথায় যায় না বলে, দু'তিন দিন পর বাড়ি ফিরে জিজ্ঞেস করলে বলে, "একটা নাটকের দলের সঙ্গে নাটক করতে বাইরে গিয়েছিলাম।" টুকাই শান্তিপ্রিয় মানুষ, এ নিয়ে কোনও ঝামেলা সে করতে চায়নি, তাই নিজেই হজম করে এসব। বাবা-মাকেও বলতে পারে না। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল যখন টুকাইয়ের কানে এল সোনিয়া তার থেকে পাঁচবছরের ছোট একটা ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে। তখন সে বাবা-মাকে সব জানায়। ৮ বছরের বিবাহিত জীবন শেষ হলো চল্লিশলাখ টাকা ও বিয়েতে ওদের বাড়ি থেকে দেওয়া হিরে-জহরতের সব গয়নার বিনিময়ে। এত সুন্দর একটা ছেলের জীবনে এমন একটা ঘটনা ঠিক মেনে নেওয়া যাচ্ছিল না। টুকাইও খুব অবসাদে ভুগছিল। ব্যবসাটা ততটাও জমে ওঠেনি, বউ ছেড়ে চলে গেল। বাবা-মা যথাসম্ভব পাশে থেকে ওর অবসাদ কাটানোর চেষ্টা করতে লাগলেন।
কেটে গেল মাঝে দুটো বছর। ইতিমধ্যে টুকাইয়ের ব্যবসা বেশ দাঁড়িয়ে গেছে। তার আরেকটি মেয়ের সঙ্গে ভালোবাসা হয়। বেশ সুন্দরী, ওর সঙ্গে মানিয়েছে ভালো। সে-ও ডিভোর্সি এবং বাঙালি নয়। সে-ও পাঞ্জাবি। বাবা-মা খুশি হন। বস্তুত ছেলের ডিভোর্স হয়ে যাবার পর তাঁরা খুবই মনোকষ্টে থাকতেন। তাঁরা দাঁড়িয়ে থেকে ছেলের আবার বিয়ে দেন, তবে এবারে আর বিয়েতে কোনও ঘটা করেন না, রেজিস্ট্রি করেই বিয়ে দেন। পরে কলকাতায় ছোট একটা অনুষ্ঠান করেন কেবল আত্মীয়-পরিজনদের ডেকে। তাদের বিয়েকে সামাজিক মর্যাদা দেবার জন্যই এটুকু করা। কদিন বাবা-মার কাছে থেকে তারা দিল্লী ফিরে যায়। টুকাই আবার নতুন করে নতুন বউ নিয়ে সংসার সাজায়। রিচা তার নাম। তার একটি ছেলে আছে। পাঁচবছর পর্যন্ত সে তার মায়ের কাছেই ছিল। পরে কোর্টের অর্ডার অনুসারে সে তার বাবার কাছে রয়েছে। রিচার মিলিটারি অফিসার স্বামী মদ খেয়ে তাকে প্রচণ্ড মারধোর করতো, আর সেটাই ডিভোর্সের গ্রাউন্ড। কিন্তু নিজের সন্তান, পাঁচবছর তাকে লালন-পালন করার পর তাকে কাছে পায় না, এ তার বড় কষ্ট। টুকাই ওর জন্য ফিল করে কিন্তু কিছুই তো ওর করার নেই। আগে সে ছুটিছাটায় মায়ের কাছে এসে থাকত তাই টুকাইও তাকে কাছে পেয়েছে। তার প্রতি ওরও একটা মায়া জন্মে গেছে আর রিচা মা হয়ে কী করে থাকতে পারে? বাচ্চাটি টুকাইকেও খুব পছন্দ করে। বাবার কাছে ফিরে গিয়ে এদের কথা বলায় তার বাবা বাচ্চাকে একদমই আর পাঠায় না মায়ের কাছে। কোর্টের অর্ডার অনুযায়ী রোজ একঘণ্টা করে ছেলের সঙ্গে মাকে কথা বলতে দেবার কথা কিন্তু ওর প্রাক্তন স্বামী তা হতে দেয় না। রিচা অবসাদে ভোগে। টুকাই ওকে সামলায়, মা পরামর্শ দেন, "একটা বাচ্চা নে তোরা, তাহলে ও অবসাদ কাটিয়ে উঠবে দেখবি।" টুকাই বলে, "মা ওর যা মনের অবস্থা সে কথা আমি ওকে বলতেই পারবো না। ওকে সময় দিতে হবে। তুমি ব্যস্ত হোয়ো না মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
মাকে তো বলল টুকাই কিন্তু ঠিক হওয়ার কোনও লক্ষণই যে নেই। ওকে আনন্দ দেবার জন্য ছুটিছাটা পেলেই বেড়াতে নিয়ে যায়, ওকে উইক এন্ডে বাইরে নিয়ে গিয়ে বড় বড় রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়। সবই করে রিচা, আনন্দও পায় কিন্তু তাতে ছেলেকে ভুলে ও থাকতে পারে না। যেখানেই যায় মনে হয় ছেলেটা যদি সঙ্গে থাকত। ভালো কিছু খেলেই মনে হয় ছেলেটা এটা খেলে খুব পছন্দ করত। টুকাই অত্যন্ত ভালো ছেলে তাই এসব শুনে ওরও মনে হতো রিচা ঠিকই বলেছে। এসব শুনে কখনও মনে হতো না ওদের আনন্দটা মাটি হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই চলছিল। একবার কাশ্মীরে গিয়ে ওরা খুব মজা করে। সেবার ফিরে আসার কিছুদিন পর রিচা বুঝতে পারে সে সন্তানসম্ভাবা। টুকাইকে সে কথা জানালে ও আনন্দে ওকে কোলে তুলে নেয়। বুঝতে পারে রিচাও বেশ খুশি হয়েছে এতে। ও রিচার যত্ন নেয় খুব। বাবা-মাকে জানালে তারাও খুব খুশি হন। সকলে মিলে রিচার শরীরের দিকে যত্ন নেয়। সকলের আন্তরিক ভালবাসায় আপ্লুত হয়ে যায়। আগত সন্তানের কথা ভেবে খুশি থাকার চেষ্টা করে, তবু মাঝে মাঝে অবসাদ এসে ঘিরে ধরে তাকে।
এসব নিয়েই নির্দিষ্ট সময়ে ফুটফুটে এক মেয়ে হয় রিচার। নাম রাখে কাশ্মীরা। তাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে সারাদিন। তার ছোট ছোট হাত-পা নাড়াচাড়া দেখে আর খুশীতে ভরে ওঠে মন। মনে পড়ে যায় ছেলে গুড্ডুও যখন ছোট ছিল ও এমনিভাবেই ওর হাত-পা নাড়াচাড়া দেখতো। খানিক বিষন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু কাশ্মীরা ওকে বিষণ্ণ থাকতে দেয় না। সারাক্ষণ মাকে ব্যস্ত করে রাখে সে। রিচার সঙ্গে গুড্ডুর আর যোগাযোগ রাখতে দেয় না ওর বাবা কোর্টের অর্ডার থাকলেও। তাই নিয়ে কোর্ট-কাছারি করার সময়সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি রিচার ছোট্ট কাশ্মীরাকে সামলে, চাকরি সামলে। ক্রমে গুড্ডু ওর মনের গোপনে রইল এক কোণে। সম্পর্কটা প্রায় শেষ। এদিকে কাশ্মীরা বড় হতে লাগল। অসম্ভব সুন্দরী হয়ে উঠল সে। বাবা-মা দুজনেই সুন্দর, আর ও যেন দুজনের সৌন্দর্যের যোগফল বা তারও বেশি। পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো হয়ে ওঠে সে ক্রমে। স্কুল পেরিয়ে এরপর সে মেডিকেলে চান্স পায়। সেখানেও অত্যন্ত ভাল রেজাল্ট করতে থাকে। এরপর সে ডাক্তারী পাশ করে। অবশেষে ওই কলেজেই এমডিতে অ্যাডমিশন নেয়। তবে ওর ডাক্তারিতে এত ভালো রেজাল্টের পিছনে একজন সিনিয়র স্টুডেন্টের অবদান রয়েছে। কাশ্মীরা যে বছর ভর্তি হয় ডাক্তারিতে, নবীনবরণ অনুষ্ঠানেই আলাপ হয় তার সঙ্গে। সেই আলাপ ক্রমে আলাপচারিতার পর্যায়ে পৌঁছায়। সে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে ওকে পড়াশোনায় সাহায্য করতে থাকে। প্রথমদিকে কেবল এটুকু থাকলেও ক্রমে দুটিমন কাছাকাছি চলে আসে। সম্পর্ক গভীর হয়।
এমডিতে ভর্তি হবার পর কাশ্মীরা মাকে তার কথা বলে। বলার সময় মায়ের চোখে ধরা পড়ে যায় মেয়ের তার প্রতি আকুতি। সে এমডি করে এক নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করছে, সঙ্গে প্রাইভেট প্র্যাকটিস। রিচা মনে মনে খুশিই হয়। তাকে দেখতে চায়। বাড়িতে নিয়ে আসতে বলে। রাতে টুকাইকে সব বলে। টুকাইও খুশি। এক ছুটির দিনে কাশ্মীরার প্রসেনজিৎকে বাড়ি নিয়ে আসার কথা। রিচা নিজে হাতে নানারকম রান্না করে রাখে। তার মেয়ের যখন পছন্দ আর ছেলেও যখন এত ভাল তাকে না মেনে নেওয়ার তো সঙ্গত কোনও কারণই নেই। অতএব রিচার হবুজামাই আসছে বাড়িতে। বাড়িঘর যথাসম্ভব সাজাতে শুরু করেছে রিচা সপ্তাহ ধরে। নানারকম মিষ্টি খাবার আগে থেকে বানানো শুরু করে দিয়েছে কারণ সে ছেলে মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসে। কাশ্মীরা খুব খুশি হয় তার পছন্দকে না দেখেই মা এভাবে স্বীকৃতি দেওয়ায়। নির্দিষ্ট দিনে প্রসেনজিত এল কাশ্মীরার সঙ্গে তার বাড়িতে। রিচাকে প্রণাম করে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই বুকের ভেতরটা রিচার কেমন করে উঠলো। তার গুড্ডুও আজ এমনই বড় হয়েছে হয়তো। জিজ্ঞেস করলো, "তোমার নাম কি বেটা?" নাম শুনে বুকে একটা ধাক্কা খেলো সে। প্রসেনজিৎ বলল, "আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে।" টুকাই দেখে ছোটবেলার সেই মুখ একটুও বদলায়নি। রিচা প্রশ্নবানে জর্জরিত করে তাকে, "ডাক নাম কী? বাবার নাম কী? মায়ের নাম কী? বাড়িতে কে কে আছে?" ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রসেনজিৎ সব বলে। আর বলে, " মা নেই।" আমি যখন খুুব ছোট বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মা আবার বিয়ে করেন কিন্তু বাবা আর বিয়ে করেননি, আমায় নিয়েই ছিলেন। ছ'মাস আগে তিনি মারা যান। এরপর নিজের পার্স খুলে একটা ছবি বার করে দেখায় রিচাকে। সে আর তার মা, খুব ছোট্টবেলায়। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে রয়েছে সে। রিচা অজ্ঞান হয়ে যায়। প্রসেনজিৎ ছবিটার সঙ্গে রিচার মিল খুঁজে পায়। এরপর এক দৌড়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তাকে আর কোথাও, খুঁজে পাওয়া যায়নি, কোনদিনও না। কাশ্মীরা মাকে সুস্থ করে তোলে। প্রসেনজিতের আচরণের মানে খুঁজে পায় না সে। মায়ের হাতে ধরা ছবিটা মা অজ্ঞান হলে মাটিতে পড়ে যায়। সেটা তুলে দেখে প্রসেনজিৎ যার গলা জড়িয়ে রয়েছে সে তো তার মা। সমস্ত পরিষ্কার হয়ে যায় তার সামনে। সেও ঘরে গিয়ে খিল দিয়ে দেয়। মুহূর্তে বাড়ির পরিস্থিতি যা হয়ে গেল টুকাই হতভম্ব। এরজন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না সে। কী করবে এখন সে বুঝে পায় না। রিচা সেই থেকে চরম অবসাদগ্রস্ত। কোনও চিকিৎসাতেই সে আর সাড়া দেয় না। একটা ভালোবাসার ফল যে একটা সংসারকে এমন তছনছ করে দেবে ভাবেনি ওরা কেউ।
