বৃষ্টির দিনে স্কুল ফাঁকি ।। শিকদার বাসির

 



রাত থেকেই ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে তাকিয়ে সাত বছরের সোহান দেখল রাস্তায় পানি জমে গেছে। গাছের পাতা থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। আকাশ ছিল ঘন কালো মেঘে ঢাকা।
সোহান মনে মনে ভাবল, "আহা! এই বৃষ্টিতে যদি স্কুল না যেতে হতো! কী মজাই না হতো!" তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। সে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে রইল।

কিছুক্ষণপর আম্মু এসে বললেন, "সোহান, উঠো! স্কুলের সময় হয়ে গেছে।"
সোহান দুর্বল গলায় বললেন,
"আম্মু, আমার মাথা খুব ব্যথা করছে। গা-ও বেশ গরম।"
আম্মু চিন্তিত হয়ে সোহানের কপালে হাত দিলেন। "সত্যিই তো একটু গরম লাগছে। ঠিক আছে, আজ স্কুল না গেলেও চলবে। বিশ্রাম নাও।" আম্মু বললেন।
সোহান মনে মনে খুশি হলো। তার পরিকল্পনা সফল! আম্মু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সোহান লাফ দিয়ে উঠে বসল। "ইয়ে! আজ স্কুল নেই! সারাদিন খেলা আর মজা!"

আম্মু নিজের কাজে বাহিরে চলে গেলেন। বাসায় শুধু সোহান আর দাদি। দাদি রান্নাঘরে ব্যস্ত। সোহান ভাবল, "এখন তো যা খুশি করতে পারি!" সে টিভি খুলে কার্টুন দেখতে শুরু করল।
একটু পরে কার্টুন দেখতে দেখতে বিরক্ত লাগল। সে তার খেলনা নিয়ে খেলতে লাগল। কিন্তু একা একা খেলতে মজা লাগছিল না। স্কুলে-তো বন্ধুদের সাথে কত মজা হতো!
বৃষ্টি তখনও পড়ছিল। বাইরে দেখছিল খুব সুন্দর। কিন্তু একা ঘরে বসে থেকে সোহানের একদম ভালো লাগছিল না।

দুপুরবেলা সোহানের সবচেয়ে ভালো বন্ধু রাফির ফোন এলো।
"সোহান! তুই আজ স্কুলে আসিসনি কেন? আমরা সবাই তোকে খুব মিস করছি !"
সোহান মিথ্যা করে বলল,
"আমি আজ একটু অসুস্থ রে...।"
রাফি একটু উত্তেজিত স্বরে বলল,
"ঐ! তুই জানিস, আজ স্কুলে কী মজা হয়েছিল! বৃষ্টিতে আমরা মাঠে ভিজেছি। টিচার আমাদের বৃষ্টির উপর একটা সুন্দর কবিতা শিখিয়েছেন। তারপর আমরা সবাই মিলে কাগজের নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসিয়েছি!"
সোহানের মন খারাপ হয়ে গেল। সে এত মজার সব কিছু মিস করেছে!
"আর কী হয়েছিল রে?" — সোহান জানতে চাইল।
রাফি বলল,
"টিচার বলেছেন বৃষ্টির পানি কীভাবে মেঘ থেকে আসে, বৃষ্টি কেন পড়ে। খুব মজার ছিল! আর আমরা ক্লাসে বসে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। টিচার আমাদের চকলেট দিয়েছেন!"
ফোন রেখে সোহান জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টি তখনও পড়ছিল। কিন্তু এখন আর ভালো লাগছিল না। সে বুঝতে পারল বন্ধুদের সাথে স্কুলে বৃষ্টি দেখলে কত মজা হতো! সে সব মিস করেছে শুধু স্কুল ফাঁকি দেওয়ার জন্য।
সারাদিন সোহান একা একা ঘরে বসে রইল। টিভি দেখল, খেলনা নিয়ে খেলল, কিন্তু কিছুতেই মন ভরল না। সন্ধ্যায় যখন রাফি আবার ফোন করে বলল তারা স্কুল থেকে ফেরার পথে কীভাবে বৃষ্টিতে ভিজেছে, কীভাবে মজা করেছে, তখন সোহানের খুব কান্না পেল।

পরদিন সকালে আবার বৃষ্টি হচ্ছিল। আম্মু এসে বললেন, "সোহান, আজও কি স্কুলে যাবে না?"
"না আম্মু! আমি আজ অবশ্যই স্কুলে যাব। আমি একদম সুস্থ আছি!" — সোহান লাফিয়ে উঠে বলল।
আম্মু একটু অবাক হলেন। সোহান তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে স্কুলে গেল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে স্কুলে পৌঁছাল। রাফি আর অন্য বন্ধুরা তাকে দেখে খুশি হলো।
রাফি বলল,
"সোহান! তুই এসেছিস! চল, আজ যেহেতু বৃষ্টি আছে। আমরা সবাই মিলে আবার কাগজের নৌকা বানাই!" সবাই কাগজের নৌকা বানালো।  একটুপর ক্লাসে শিক্ষক বৃষ্টি নিয়ে গল্প বললেন। তারপর সবাই মিলে বৃষ্টির ছবি আঁকল। বন্ধুদের সাথে বৃষ্টি উপভোগ করতে করতে সোহান বুঝল — একা ঘরে বসে থাকার চেয়ে বন্ধুদের সাথে স্কুলে থাকা কত বেশি আনন্দের!

বিকেলে বাড়ি ফিরে সোহান আম্মুকে গতকালের সব সত্যি ঘটনা খুলে বলল।
"আম্মু, আমি গতকাল সত্যিই অসুস্থ ছিলাম না। আমি মিথ্যা বলে স্কুল ফাঁকি দিয়েছিলাম। আমি ভুল করেছি।" — সোহান মাথা নিচু করে বলল।
আম্মু সোহানকে কোলে বসিয়ে বললেন, "তুমি সত্যি বলেছ, এটা খুব ভালো কথা। কিন্তু মিথ্যা বলা খুব খারাপ। স্কুল ফাঁকি দিলে তুমি নতুন কিছু শিখতে পারবে না, বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে পারবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা, মিথ্যা বলার পর মন খারাপ থাকে, তাই না?"
"হ্যাঁ আম্মু। আমি আর কখনও স্কুল ফাঁকি দেবো না। সত্যি বলতে আমি গতকাল একদম একা একা ছিলাম। কোনো মজাই হয়নি।" — সোহান বলল।
আম্মু হেসে সোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

সোহান সেদিন থেকে আর কখনও স্কুল ফাঁকি দেয়নি। বৃষ্টি হোক বা রোদ হোক, সে প্রতিদিন খুশি মনে স্কুলে যেত। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল — বন্ধুদের সাথে স্কুলে থাকাটাই সবচেয়ে মজার আর আনন্দের। পাশাপাশি প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার সুযোগ'তো আছেই। 

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post