বৃষ্টিমুখর এক অপরাহ্ণের অপমৃত্যু ।। সুশান্ত কুমার দে

 



এখন আষাঢ় মাস। সকাল থেকেই রিমঝিম বৃষ্টি পড়ছে। উঠোনে কাঁদামাটি, আর নোংরা আবর্জনা একত্রিত হয়ে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দু'পা বাড়ালেই তনুদের বাড়ি। তনুর মা, রতনকে ভালো চোখেই দেখেন। কেননা রতন মাঝে মাঝে তনুকে অংক, ইংরেজি বুঝিয়ে দেয়। রতনের দুই বছরের ছোট তনু। রতন অংক ও ইংরাজিতে বেশ অভিজ্ঞ।  সে কারণেই রতনের কাছে মাঝে মাঝে অংক, ইংরেজিটা শিখতে আসে তনু। এক জোড়া চটি পায়ে দিয়ে ইটের উপর দিয়ে ডিঙিয়ে তনুদের বাড়ি এল রতন। তনু বাড়িতে একাই, একটা মিষ্টি হাসি হেসে তনু, একটা চোকি পিঁড়ি রতনের দিকে ঠেলে দেয়। রতন পিঁড়ি খানা টেনে বসে পড়ল। 
তনু বলল: মা একটু দাদুকে দেখতে জালালপুরে গেছেন। এক্ষুনি হয়তো এসে পড়বেন, দাদু ভীষণ অসুস্থ! 
রতন উঠে দাঁড়িয়ে বলল: আমি তাহলে যাই তনু? 
তোমার মা এলে হয়তোবা অন্য কিছু ভাবতে পারেন; পরে না হয় আবার আসব !
তনু, রতনের হাতটা টেনে ধরে বলল:  তুমি এখন যেওনা;  রতনদা। দেখতে পাচ্ছ না,কেমন জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। প্রচণ্ড মেঘ ডাকছে। এ অবস্থায় তুমি এসেই; আমাকে ফেলে চলে যাবে? আমার বুঝি ভয় করে না?
রতন কিছুটা ইতস্তত ভাবে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে।  বৃষ্টি থামলেই না হয় যাব। বৃষ্টি তো আর তাড়াতাড়ি থামার লক্ষণই নেই, বরং ক্রমশই বাড়ছে! দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বিদ্যুৎ চলে গেছে। এখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, সেই সাথেই গুড়ুম গুড়ুম মেঘের আওয়াজ। এ অবস্থায় রতন, তনুকে একাকী ফেলে বাড়ি যেতে পারছে না। তনুরও ভীষণ ভয় করছে। এই ভরা বৃষ্টি বাদলের মধ্যে ওর মা, কি করে আসবে?
তনু, তার লাল মুখখানা একটু ভ্যাবাচ্যাকা করে বলল, আমাকে বিপদে ফেলে তুমি যেওনা রতন দা? রতন ঈষৎ আলোয় তনুর দিকে তাকাতেই, লজ্জায় মুখটা সরিয়ে নিল। তার দুচোখেই এক মায়াবী হরিণীর প্রতিচ্ছবি। নব দিগন্তের মাঝেই, যেন একটুকরো আলোর স্ফূলিঙ্গ দেখতে পেল। অতি ফর্সা তনুর গায়ের রং, তার পড়নে একটা পাতলা সিনথেটিকের সালোয়ার কামিজ। কামিজের উপরিভাগ থেকে তনুর সুডৌল স্তনযুগল আবছা আলোয় সোনা রঙে ঝলমল করছে। রতনের দৃষ্টিটা,  হঠাৎই তনুর বক্ষ যুগলের অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে বিচরণ করল।
হয়তোবা, এই প্রথমই কোন মেয়ের সুডৌল ফুলে ফেঁপে ওঠা দুটি গোলাকৃতি পয়োধর রতনের শুভ দৃষ্টিতে এসে বিচ্ছুরণ ঘটালো। পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যের সীমা লঙ্ঘন করে, তনুর দেহের নিভৃতেই লুকিয়ে রাখা সৌন্দর্যটাই, রতনকে অতিমাত্রায় আকৃষ্ট করেছে। রতনের বুকের ভেতরটা যেন, একটা মাঝারি ভূকম্পনের অনুভূতি অনুভূত হচ্ছে। তনু বুঝতে পারে, রতন তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তনু লজ্জা পেয়ে তার লজ্জাবসন টি একটু টেনেটুনে ঠিক করে নেয়। রতন ও, লজ্জায় চোখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয়। হঠাৎই আকাশের বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত হয়ে; বিকট শব্দে অতি সন্নিকটে যেন বজ্রপাত পড়ল।  ঘরের আসবাবপত্র , থালাবাটি ঝনঝন করে বেজে উঠল।  তনু দিশেহারা হয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রতনকে জাপটে ধরল। রতনও,  সুযোগটা কাজে লাগিয়ে, তনুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সৌন্দর্যের লীলাভূমির উপর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে লাগল।
তনুর বক্ষের গোলাকৃতি দু টুকরো মাংসপিণ্ড যেন রতনের বুকের সাথে লেপ্টে যাঁতাকলের মতো পিষ্ট হতে লাগলো।
তনুর অন্তর থেকে ভয়ের হিংস্র দানবটা মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল। তার সারা শরীরের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে;  একটা রোমাঞ্চকর সুখানুভূতি। এমন সুখানুভূতির ছোঁয়া এই দুটো অবোধ হৃদয়ের মাঝে এই প্রথমই ছুঁয়ে দিল।
তনুর দেহের শিরা উপশিরায় এক নব উদ্দীপনার শিহরণে সিক্ত হয়ে, তার লুকানো ধনসম্পদ দুহাত ভরে রতনকে বিলিয়ে দিতে চাইল। জীবনের সকল ভয়ভীতি, দুঃখ কষ্টকে জলাঞ্জলি দিয়ে অনন্ত সুখ সাগরে  নিমগ্ন হল দুটো অবুঝ প্রাণ। ঠিক এমনই সময় তনুদের ঘরের দরজায় অনবরত ঠকাস্ -ঠকাস্ আওয়াজ হচ্ছে। এই ঝড় বাদলে ভিজতে ভিজতে হয়তোবা তনুর মা এসেছেন। তনু ও রতনের নিগূঢ় প্রেমের বেষ্টনী সহসা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। রতন পালাবার পথ খুঁজতে থাকে। তনু, রতনকে পিছনের দরজা টা দেখিয়ে দিল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তনুর মা, জোরে,জোরে তনু, তনু বলে ডাকছে।
ভাবছে মেয়েটা একা ;  নিশ্চয়ই ভয় -টয় পেয়েছে।
আরে, তনু মা, তাড়াতাড়ি দরজা টা খোল? তনু দরজা খুলেই দেখলো, মা, এই ঝড় বাদলের মধ্যেই ভিজতে ভিজতে এসেছেন।  তার পরনের কাপড়- চোপড় ভিজে ছপছপ করছে।  রতন পিছনের দরজা দিয়ে বের হতেই, তনুর মা আবছা আলোয় দেখতে পেল ,কে যেন বাড়ির পিছন দিয়ে ছুটে পালাচ্ছে।
তনুর মা, চিৎকার করে বলে উঠলো, আরে তনু, পিছনের লাইট টা তাড়াতাড়ি জ্বেলে দে? মনে হয় বাড়িতে চোর ঢুকেছে ,ওরে কে কোথায় আছিস , শিগগিরই আয়? ঐ  দ্যাখ, দ্যাখ - একটা চোর ছুটে পালাচ্ছে।
তনু বলল, মা; তুমি আগে ভিজে কাপড়টা পাল্টে ফেল তো?
চোর টোর পরে দেখা যাবে। 
ততক্ষণে রতনদা পগারপার হয়ে তার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাল। 

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post