আঁধার নেমেছে আকাশ জুড়ে। ভেঙে ভেঙে ভাসা ভাসা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, নেই মেঘের গর্জন। রয়েছে অভিমানে অভিযোগে পথচলা মেঘে ঢাকা চাঁদের। উঁকি দেয় মাঝে মাঝে হালকা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে। শ্রাবণের ঝরো ঝরো ঝরবে হয়তো বৃষ্টি। ক্রন্দন করবে আকাশ, ভিজবে বাতাস ও মাটি। শান্তির ছায়া চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। পাতায় পাতায় ছুঁয়ে যাবে নীরব ঠান্ডা অনুভূতি।
শাকিলা জানালার ধারে বসে বসে বিছায়ে রেখেছে স্মৃতির মিনার। সেদিনও ছিল বৃষ্টিমূখর এক মায়াবী গোধূলি। পশ্চিম আকাশে লাল আভা ঘোলাটে হয়ে আসছিল। হঠাৎ সামনের ঘর থেকে চিৎকার ভেসে এসেছিল, "মা মাগো কথা বলো"। ছোটো ভাই মিজানের হৃদয় ভাঙা কান্নার স্বরে শাকিলা ভিজতে ভিজতে এ ঘর থেকে ওঘরে গিয়ে দেখলো, মা আর নেই।
বাবা সাজ্জাদ মোদি গ্রামের হাটের উপর দোকান দিয়ে মোদিখানার ব্যবসা করে। বাজারের উপর সবচেয়ে বড়ো দোকান এটা। তেল লবন ঝাল মশলা থেকে শুরু করে চালআটা—এমন কী নেই এই দোকানে? সবকিছু রয়েছে। মোদি ব্যবসার কারণে সাজ্জাদের নাম হয়ে গেছে সাজ্জাদ মোদি। তখন শাকিলার বয়স বিশ-একুশ বছর হবে। আর মিজানের বয়স ১৮/১৯ বছর ছিলো।
বছর ঘুরতে না ঘুরতে সাজ্জাদ মোদি বিয়ে করে বাড়িতে বউ নিয়ে এসেছিল। এখন সৎমায়ের সংসারে শাকিলা রয়েছে। বিভিন্ন রকম দূর্নাম নিয়েই থাকতে হয়। মিজান সৎমায়ের উপর রাগ করে, বাবার কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে দালাল ধরে মালয়েশিয়ায় চলে গেছে। এর মাঝে শাকিলারও বিয়ে হয়েছিল, সে স্বামীর ঘর টেকেনি।
রোকসানা প্রথম ছয় মাস মুখে মধু রেখেছিল। "আমি তোর মা-ই হলাম মা," বলত আর ভাত বেড়ে নিজ হাতে খাওয়ায়ে দিত। সাত মাসের মাথায় হিসাব নিয়ে ঝগড়া বাঁধল। সাজ্জাদ মোদি দোকান থেকে ফিরে বলল, "মেয়ে মানুষ এত কথা কিসের? চুপ করে থাক।"
শাকিলা চুপ করল না। সে বলল, "বাবা, মা মরার চল্লিশ দিনও হয়নি। তুমি ভুলে গেলে?"
সাজ্জাদ থাপ্পড় মারল না। কিন্তু চোখ ফিরিয়ে নিল। সেদিন থেকে সে আর মেয়ের দিকে সোজা তাকায় না।
রোকসানার আসল চেহারা বের হলো ধীরে ধীরে। সে শাকিলার নামে পাড়ায় বলে বেড়াত, "মেয়ে নাকি রাত করে ছাদে বসে থাকে। কে জানে কার সাথে কথা বলে!" গ্রামে একটা কথা ছড়াতে দুই দিন লাগে না। তিন দিনের মাথায় শাকিলা হয়ে গেল "চরিত্রহীন"।
শাকিলা জানে, সে ছাদে বসে শুধু মায়ের শাড়িটা ধরে কাঁদে। কিন্তু কে শোনে সেই কথা? সৎমায়ের দুই ছেলে হলো। বাড়ির ভাগাভাগি শুরু হলো। সাজ্জাদ মোদি বলল, "মেয়েকে আর কত খাওয়াব? বিয়ে দিয়ে বিদায় করো।"
পাত্র ছিল পাশের গ্রামের কুদ্দুস। বয়স চল্লিশ, বউ মরেছে দুই বছর আগে। তিন একর জমি আছে, কিন্তু নেশা করে । সাজ্জাদ বলল, "জমি আছে, এটাই যথেষ্ট। মেয়ে সুখে থাকবে।"
শাকিলা বলল, "আমি ওকে চিনি না বাবা।"
সাজ্জাদ বলল, "চেনার দরকার নেই। বিয়ে হলেই চিনবি,মেয়েদের বিয়ে হলেই স্বামীকে চিনে।
বিয়ে হলো। ছয় মাস টিকল না। কুদ্দুস নেশা করে রাতে ফিরত। গালি দিত, মারত। এক রাতে মেরে বলল, "তোর বাপের দোকানে মাল বাকি, অনেক টাকা পাবে,শোধ দিবি না?"
শাকিলা কিছু না বলে নীরবে,ভোরবেলা কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে বেরিয়ে আসে। পেছনে ফিরে তাকায়নি।
গ্রামে ফিরে শুনল, রোকসানা বলছে, "আমি আগেই বলেছিলাম, মেয়ের কপাল খারাপ,পোড়া কপালি। স্বামী ঘর টেকবে না।"
সাজ্জাদ মোদি এবার চুপ থাকলো। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা হুহু করে ওঠে,কিছু বলতে পারে না।
মিজান ততদিনে টগবগে যুবক। সৎমায়ের খোঁটা সে সহ্য করতে পারত না। একদিন রাতে বাবার আলমারি ভেঙে দুই লাখ টাকা নিয়ে বেরিয়ে যায়। দালাল ধরে, মালয়েশিয়া যাবে।
শাকিলা বলে, "ভাই, যাস না,ভাই আমার। ওরা মানুষ পাচার করে।"
কে কার কথা শোনে। মিজান হাসতে হাসতে ক্ষোভে অভিমানে বেরিয়ে যায়, "বুবু", এখানে থাকলে তো আমি মানুষই থাকব না। আমি যাব। তুই দেখিস, আমি টাকা পাঠাব। তখন তুই ভালো থাকবি। তুই আর এই বাড়িতে থাকবি না।"
দুই বছর কোনো খবর নেই। হঠাৎ একটা চিঠি এলো। ভাঙা বাংলা, ইংরেজি মেশানো: "বুবু" এখানে কাজ খুব কষ্টের। রুমে আটজন থাকি। তুই চিন্তা করিস না, টাকা পাঠাব।"
টাকা এলো না। দালাল বলেছে, ভিসা জাল ছিল। মিজান এখন অবৈধ। ধরা পড়লে জেল হবে।
গ্রামে তখন মেম্বার নির্বাচন। দুই পক্ষ—সাজ্জাদ মোদির পক্ষ আর ইউনুস চেয়ারম্যানের পক্ষ। সাজ্জাদ মোদি ভেবেছিল, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে, ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে সে এবার মেম্বার হবে।
কিন্তু রোকসানা চায় তার ছোট ছেলে সোহেলকে মেম্বার বানাতে। সে শাকিলাকে বলে, "তুই যদি আমার পক্ষে ভোট চাস, তাহলে তোকে আদরে রাখব। ঘর থেকে বের করব না।"
শাকিলা বলল, "আমি ভোট দেব না। আমি কারও দাসী না।"
সেই রাতেই রোকসানা পাড়ায় রটিয়ে দিল, শাকিলা নাকি ইউনুস চেয়ারম্যানের লোকের সাথে রাতে দেখা করে। ইউনুসের বয়স ষাট, তিন বউ। শাকিলা হবে চতুর্থ বউ।
পাড়াপ্রতিবেশিরা হাসতে হাসতে, আবার কেউ কেউ মুখে আঁচল দিয়ে, মুখ টিপে বলে,ভালোই হবে ধর্ম চতুর্থ বউকে মেনে নেয়। চেয়ারম্যানও চার নম্বর বউটা নিয়ে ভালোই থাকবে।
শাকিলার নামে সালিশ বসে। মেম্বার বলল, "মেয়ের মুখে কালি মাখিয়ে গ্রামছাড়া করো।"
শাকিলা দাঁড়িয়ে বলে, "আমি কারও সাথে দেখা করিনি। তোমরা প্রমাণ দেখাও।"
প্রমাণ নেই। কিন্তু প্রমাণ লাগে না গ্রামে। একটা কথা বললেই হয়।
সালিশের পর শাকিলা বোঝে, এই বাড়িতে তার জায়গা নেই। সে হাটের পেছনে পুরনো বটগাছটার নিচে বসে ভাবে,তাকে নিচ পায়ে দাঁড়াতে হবে । মাথার উপর শূন্য আকাশ। দূরে মসজিদে আজান হচ্ছে।
সে মনে মনে বলে, "মা, তুমি যদি একবার ডাকতে..."
মায়ের ডাক আসে না। শুধু বাতাসে পাতার শব্দ হয়,সে শব্দের মাঝে মায়ের কথা মনে মনে শুনতে পায় । সেটাকেই উত্তর ধরে নিয়ে শাকিলা উঠে দাঁড়ায়।
কাল থেকে সে হাটে সাজ্জাদ মোদির দোকানের পাশে একটা ছোট পিঁড়ি পেতে বসে। হাতের কাজ জানে—সেলাই, আচার বানানো। দুই টাকা, পাঁচ টাকা করে জমাতে থাকে।
রোকসানা রেগে ফেটে পড়ে। "এই বেশ্যা মেয়ে আমার মানসম্মান খাবে!"
কিন্তু শাকিলা এবার আর ভয় পায় না। সে বলল, "তুমি আমাকে যা খুশি বলো। কিন্তু আমার পিঁড়ি আমি সরাব না। এটা আমার রুটি ও রুজিও।"
আস্তে আস্তে মেয়েরা আসতে থাকে। শাকিলা সেলাই শেখায়, আচারের রেসিপি দেয়। মাস শেষে পাঁচ হাজার টাকা রোজগার হতে থাকে । নিজের নামে ব্যাংকে একাউন্ট খোলে।
পাঁচ বছর পর মিজান ফিরে আসে ।একদম খালি হাতে। মুখে দাড়ি, চোখে গর্ত এবং ক্ষুধার্ত । দালাল তাকে ভুয়া কোম্পানিতে পাঠিয়েছিল। তিন মাস কাজ করিয়ে বেতন দেয়নি। পুলিশ ধরেছিল। দেশে ফেরার টিকিট নিজে কিনেছে ধার করে। সে ধারও পরিশোধ করতে হবে।
সে বাড়িতে ঢুকে প্রথমে শাকিলার পিঁড়ির সামনে দাঁড়ায়। বলে, "বুবু", আমি হেরে গেছি।"
শাকিলা কিছু বলে না। শুধু তার হাতে এক গ্লাস পানি দেয়।
রোকসানা বলে, "নষ্ট ছেলে। ঘরে জায়গা নেই।"
সাজ্জাদ মোদি মাথা নিচু করে বসে থাকে,মিজানের দিকে তাকাতে পারে না, হায় আমার ছেলে! কী অবস্থা হয়ে গেছে?
সাজ্জাদ মোদির দোকানের ব্যবসা এখন আর আগের মতো নেই। ছোট ছেলে সোহেল জুয়া খেলে সব উড়িয়েছে দিয়েছে।
মিজান বলে, "বুবু, আমি তোকে কথা দিয়েছিলাম টাকা পাঠাব। পারিনি বুবু,হাউমাউ করে কাঁদে। "
শাকিলা বলে, " ভাই আমার তুই বেঁচে ফিরেছিস, এটাই যথেষ্ট ভাই। টাকা দিয়ে কী হবে?"
রোকসানা দেখে, শাকিলার পিঁড়িতে এখন দশটা মেয়ে কাজ করে। তার নিজের ছেলে সোহেল বেকার। সে সাজ্জাদকে বলে, "মেয়েকে তাড়াও। নইলে আমি যাব।"
সাজ্জাদ মোদি এবার রেগে যায়। বলে, "তুমি যাবে যাও। কিন্তু মেয়েকে আমি তাড়াব না। ও না থাকলে, এই বাড়ি কবে ভেঙে পড়ত। সংসার উচ্ছেদ হতো।
সেই রাতে রোকসানা আগুন ধরাল শাকিলার পিঁড়িতে। সব পুড়ে ছাই। সেলাই মেশিন, আচারের বয়াম, জমানো টাকা।
শাকিলা পুড়তে থাকা আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে । কাঁদে না। শুধু বলে, "তুমি আমার জিনিস পোড়াতে পারো। আমার মন পোড়াতে পারবে না মা।"
পাড়ার লোক জড়ো হয়। ইউনুস চেয়ারম্যান আসে। সে বলে, "থানায় মামলা করো শাকিলা।"
শাকিলা বলে, "না। মামলা করলে,মা জেলে যাবে। সম্মান যাবে। গ্রাম ভাঙলেও, আমি ভাঙব না।"
আগুনের পর শাকিলা ভাঙা পিঁড়ি কুড়িয়ে আবার বসল। এবার মেয়েরা নিজেরা টাকা তুলে তাকে নতুন মেশিন কিনে দেয়।
মিজান বলে, "বুবু, আমি আর তোকে ছেড়ে যাব না। আমি তোর সাথে কাজ করব।"
শাকিলা হাসে,আদর করে । প্রথমবার সত্যিকারের হাসি। "তুই থাকলে আমি ভয় পাই না ভাই।"
সাজ্জাদ মোদি একদিন এসে বলে, "মা, আমাকে মাফ করিস। আমি বুঝিনি।"
শাকিলা বলে, "বাবা, মাফ চাইতে হবে না। তুমি শুধু পাশে থেকো।"
রোকসানা একদিন চুপচাপ বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তার ছেলে সোহেলকে নিয়ে। যাওয়ার আগে বলে, "তুই জিতলি শাকিলা। কিন্তু এই গ্রাম তোকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।"
শাকিলা বলে, "গ্রাম শান্তিতে থাকতে না দিলেও আমি শান্তিতে থাকব। কারণ এই মাটি আমার মায়ের,তুমিও থাকো মা।"
রোকসানা আবেগে আপ্লূত হয়ে চিৎকার করে কাঁদে,তুই মেয়ে না; তুই আমার মা।
বছর দুই পর শাকিলার ছোট্ট কারখানা হয়। বিশএকুশ জন মেয়ে কাজ করে। আচার, সেলাই, হাতের কাজ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে ঢাকা পর্যন্ত যায় শাকিলার ছোটো কারখানার উৎপাদিত মালামাল।
মিজান এখন হিসাব রাখে।মাঝে মাঝে ঢাকায় যায়। সে আর স্বপ্ন দেখে না বিদেশের। সে বলে, "বুবু, আমাদের স্বপ্ন এখানেই। এই মাটিতে।" ছোটো সৎভাই সোহেলকে ধরে আনে,তুই বুবুর কাছে থাকবি,যা বলে শুনবি। সোহেল ছলছল চোখে শাকিলার দিকে তাকিয়ে থাকে। শাকিলা তার শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে ধরে সোহেলকে।
গ্রামের লোক এখন আর শাকিলাকে "চরিত্রহীন" বলে না। বলে, "ওই যে শাকিলা, ওর মতো মেয়ে ঘরে থাকলে,ঘর উজ্জ্বল হয়, সম্মান বাঁচে, ঘর বাঁচে।"
রাত হলে শাকিলা আবার জানালার ধারে বসে। আকাশে মেঘ নেই। চাঁদ পরিষ্কার।
দূরে আবছা আলো আবছা আঁধারে মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে, সে মনে মনে বলে, "মা, দেখো। আমি হারিনি।"
জীবন তাকে পুড়িয়েছে। কিন্তু আগুনে শুধু ছাই হয় না, কখনো কখনো লোহাও পোড় খেয়ে শক্ত হয়।
শাকিলার জীবনটা এখনো জ্বলছে। আর জ্বলন্ত আগুন এখন আলোও দেয়।
