বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে গ্রাম বাংলার সরল জীবনে,যেখানে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতো হাতের তৈরি শিল্পকর্ম। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ পর্যন্ত এই কুটির শিল্পগুলোই ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কালের স্রোতে এবং যন্ত্রের দাপটে সেই গৌরব আজ ম্লান হয়ে গেছে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী বহু ব্যবহার্য জিনিস আজ বিলুপ্তপ্রায়। গ্রাম বাংলার সেই হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে হলে এই শিল্পগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করা খুব জরুরি। হারিয়ে যাওয়া বিলুপ্তপ্রায় কুটির শিল্প গ্রাম বাংলার দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পকলার অপরিহার্য অংশ ছিল। এক সময়ের প্রাণ ছিল যে কুটির শিল্পগুলো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নে বর্ণনা করছি :
১. শীতল পাটি:
শীতল পাটি শুধু একটি শয্যা উপকরণ নয়, এটি একটি শিল্প। মূলত সিলেটের মুর্তা নামের এক প্রকার বেত বা নলখাগড়া দিয়ে এটি তৈরি করা হতো। মুর্তা গাছ ভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে প্রচুর জন্মে। শীতল পাটির বিশেষত্ব হলো এর মসৃণতা ও শীতলতা, যা গ্রীষ্মকালে স্বস্তি দেয়। একসময় শীতল পাটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছিল এবং ব্রিটিশ রাজদরবারেও এর কদর ছিল। দুঃখজনকভাবে, মুর্তা বাঁশের চাষের জমি কমে যাওয়া, পাটি তৈরির কারিগরদের আর্থিক দুর্বলতা এবং প্লাস্টিকম্যাটের সহজলভ্যতার কারণে এই শিল্প আজ বিপন্ন প্রায়। সঠিক কারিগর ও পর্যাপ্ত পরিমাণে চাহিদা না থাকায় এ পাটি তৈরির বিশেষ কৌশল গুলোও আজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
২. মাটি ও পিতলের হাঁড়ি-পাতিল:
মাটি ও পিতলের হাঁড়ি বা মৃৎশিল্প প্রাচীন বাংলার এক অপরিহার্য কুটির শিল্প। এর মধ্যে ‘মাটির রঙিন শখের হাঁড়ি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। এগুলি সাধারণত বিয়ে, পূজা বা অন্যান্য লোক-উৎসবে ব্যবহৃত হতো এবং তাতে হাতে আঁকা থাকত নানান লোক-নকশা। যেমন মাছ, পাখি, লতাপাতা ও সামাজিক চিত্র। এগুলি ছিল মাটির পাত্রে গ্রামীণ জীবনের গল্প। প্লাস্টিক, সিরামিক ও অ্যালুমিনিয়ামের নানান রকম সৌন্দর্যের আধিপত্যে মৃৎশিল্প এখন শুধুমাত্র মেলা বা উৎসবের শো-পিসে পরিণত হয়েছে। একসময়কার কুমারপাড়াগুলো এখন নীরব। আর কাজ নেই। তাই বাধ্য হয়ে পেশা চেঞ্জ করতে হচ্ছে।
৩. ঢেঁকি :
যদিও এটি কুটির শিল্প নয়, এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় ধান থেকে চাল তৈরি করা বা গুঁড়ো মশলা তৈরির মূল যন্ত্র ছিল কাঠের তৈরি ঢেঁকি। এটি শুধু গ্রামীণ মহিলাদের নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিসই ছিল না, বরং এটি ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শ্রমের প্রতীক। আধুনিক চালকল বা রাইস মিলের আবির্ভাবের ফলে ঢেঁকি এখন একেবারেই বিলুপ্ত। নতুন প্রজন্ম হয়তো কেবল কবিতায় বা লোককথায় এর নাম শুনতে পাবে। আমি দেখেছি ছোট্ট বেলায় ভোরবেলা থেকেই আম্মু , দাদি, চাচীরা ঢেঁকিতে কাজ করতেন। ধান, চাল ইত্যাদি ভানতেন। দুইজন বা একজন ঢেঁকিতে পা দিয়ে পাড়া দিতো আর একজন সামনে থেকে ধান বা চাল উলটে পালটে দিতেন। ঢেঁকি এখন জাদুঘরে রাখার জিনিস হয়ে গেছে।
৪. হাত পাখা:
বাংলায় একটি বিখ্যাত গান আছেÑ “তোমার হাত পাখার বাতাসে /আমার প্রাণ জুড়িয়ে আসে।” এই সেই বিখ্যাত হাত পাখা যা গরমে শীতল হাওয়ার প্রতীক। বিভিন্ন প্রকারের বাঁশ, তাল পাতা, বেত বা কাপড় দিয়ে হাতে তৈরি করা হাত পাখা ছিল একসময়ের বিদ্যুৎবিহীন গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। এসব পাখায় নকশা, পুঁতির কাজ ও বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করা হতো। এটি তৈরি করাও ছিল গ্রামীণ পরিবারের একটি আয়ের পথ। বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক পাখার সাথে সাথে প্লাস্টিকেরনানান ডিজাইন এর হাতপাখাআগমনের ফলে হাতে তৈরি হাত পাখার এই শিল্পকে প্রায় একেবারেই বিলুপ্ত করে দিয়েছে। আজকাল বাজারে সহজলভ্য সস্তা প্লাস্টিকের হাত পাখা বাজারে এলেও, সেই সুক্ষè কারুকার্যখচিত পাখাগুলো আর দেখা যায় না।
৫. ধান রাখার বড় গোলা ও ছোট ছোট বেতের ঝুড়ি:
কথায় কথায় আমরা বলি, বাংলার অতীত ঐতিহ্য মানেই গোয়ালে গরু আর গোলা ধানে ভরা। এই সেই গোলা। যেটা বাসের চাটাইয়ের বা বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি হতো স্পেশাল ভাবে। একটু বড় ধরনের জায়গা বানানো হতো যেখানে ধান রাখা হতো। যেটা এখন আদৌ দেখা যায় না। একেবারে খুব সাদামাটা গ্রাম ছাড়া এটার প্রচলন আর নেই বললেই চলে। এটা জাদুঘরেও আর দেখতে পাওয়া যায় না। কারণ জাদুঘরে রাখার জিনিস এটা না। এর পাশাপাশি ধান, গম ও বিভিন্ন চৈতালি ফসল উঠান থেকে ঘরে আনা নেয়ার জন্য বিশেষ ধরনের একটা ঝুড়ি পাওয়া যেত। এটা বড় ছোট দুই রকমের ছিল। যেটা মোটা বেত দিয়ে তৈরি হতো। আমাদের গ্রামের ভাষায় এটাকে ধামা বা কাটা বলা হয়। এটার বিভিন্ন মাপ ছিল। যেমন ৫ কেজি, ১০ কেজি। সবার বাড়িতে তখন দাঁড়িপাল্লা ছিল না। তাই এই ধামা বা কাটা দিয়ে ধান, গম, খেসারি ও মসুর ইত্যাদি মাপা হতো। আরেকটা ছিল বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি আমরা যেটাকে ডালি বা ঢাকী বলি। এটাতে বিশেষ করে যারা মাটি কাটার কাজ করতো তারা মাটি কেটে মাথায় করে টেনে আনতো।
এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা অবশ্য কর্তব্য:
এই বিলুপ্তপ্রায় কুটির শিল্পগুলো শুধু ব্যবহার্য জিনিস নয়, বরং এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সৃজনশীলতার প্রতীক। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আর টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কারিগরদের আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নকশা ঠিক রেখে আধুনিক জীবনের ব্যবহার উপযোগিতা অনুসারে পণ্যের ডিজাইন পরিবর্তন করতে হবে। এক কথায় যুগোপযোগী ডিজাইন করতে হবে। এখনকার মানুষজন অতীত ঐতিহ্যের প্রতি বেশ আগ্রহী। তাই সঠিকভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও হস্তশিল্প মেলাগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সব চাইতে মূল কথা হলোÑ এই সকল কুটির শিল্প বা হস্তশিল্প ফিরিয়ে আনতে হলে সর্বাজ্ঞে কাঁচামালের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। কাঁচামালের উৎপাদন ছাড়া এগুলো ফিরিয়ে আনা কোনভাবেই সম্ভব না। বর্তমানে বাঁশের উৎপাদন কমে গেছে, বেতের ঝোঁপঝাড় খুঁজেই পাওয়া যায় না! ঘারিয়ে যাওয়া এই শিল্পগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটাতে পারলেই আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা রক্ষা পাবে। আর বর্তমান আধুনিক প্রজন্ম পরিচিত হবে তাদের শিকড়ের সঙ্গে।
