ঈদের আনন্দ ও শৈশব স্মৃতি ।। মাসুদ রানা

 



ঈদ আসলেই আমাদের গ্রাম যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। সারা বছর যে গ্রামটা শান্ত-নিরিবিলি থাকে, ঈদের সময় সে গ্রাম রঙিন হয়ে ওঠে। শহরে থাকা বড় ভাই, বোন, চাচা, মামারা সবাই ছুটে আসে গ্রামের বাড়িতে। কারো বাবা চাকরি করেন শহরে, কারো ভাই পড়াশোনা বা কাজের জন্য দূরে থাকে—কিন্তু ঈদ এলেই সবাই যেন এক অদৃশ্য টানে ফিরে আসে শিকড়ের কাছে।
ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল সীমাহীন আনন্দ। রমজান মাসের শেষের দিকে চাঁদ দেখার অপেক্ষা—কবে আকাশে সেই রুপালি চাঁদ উঠবে! চাঁদ দেখার খবর এলেই চারদিকে “ঈদ মোবারক” ধ্বনি। তখন মনে হতো, যেন পুরো পৃথিবীটাই আমাদের জন্য সাজানো হয়েছে।
ঈদের আগের দিন ছিল সবচেয়ে ব্যস্ত। মা রান্নাঘরে সেমাই ভাজতেন, দুধ জ্বাল দিতেন, পায়েসের জন্য বাদাম-কিশমিশ সাজিয়ে রাখতেন। ঘরে ঘরে মিষ্টির ঘ্রাণ ভেসে বেড়াত। আমরা ভাইবোনেরা নতুন জামা-কাপড় বারবার বের করে দেখতাম। নতুন জামার গন্ধে মন ভরে যেত। কখন সকাল হবে, কখন সেই জামা পরে বাইরে বের হবো—এই অপেক্ষায় রাত কাটত না।
ঈদের সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। গোসল করে নতুন পোশাক পরতাম। কেউ নতুন পাঞ্জাবি, কেউ নতুন ফ্রক, কেউবা নতুন শার্ট-প্যান্ট। হাতে নতুন ঘড়ি, চোখে নতুন চশমা—নিজেকে যেন রাজা-রানী মনে হতো। তারপর বাবার হাত ধরে বা বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম ঈদগাহ মাঠে।
ঈদগাহের সেই দৃশ্য আজও চোখে ভাসে। সাদা টুপি আর পাঞ্জাবি পরা মানুষে মাঠ ভরে যেত। সবাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়ত। নামাজ শেষে কোলাকুলি—ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই এক হয়ে যেত। মনে হতো, ঈদ যেন আমাদেরকে সত্যিকারের ভাই-ভাই করে তোলে।
নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে শুরু হতো সালামি নেওয়ার পালা। বাবার কাছ থেকে নতুন টাকা, মায়ের কাছ থেকে মিষ্টি হাসি আর সালামি, বড় ভাই-বোনদের কাছ থেকেও কিছু টাকা—এই ছোট ছোট টাকাই ছিল আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। সেই টাকা দিয়ে কিনতাম বেলুন, চকলেট, চানাচুর, মালাই আইসক্রিম। কখনো গ্রামে বসা ছোট্ট মেলায় যেতাম।
গ্রামের ঈদের মেলা ছিল অন্যরকম আনন্দে ভরা। নাগরদোলা ঘুরত আকাশ ছুঁয়ে। আমরা ভয়ে ভয়ে উঠতাম, আবার আনন্দে চিৎকার করতাম। রঙিন খেলনা, বাঁশি, মাটির পুতুল—সবকিছুই যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করত। কখনো বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে যেতাম। ছোট্ট সেই অভিজ্ঞতাই ছিল বিশাল আনন্দের।
ঈদের আরেকটা বড় আনন্দ ছিল সবাইকে একসাথে পাওয়া। শহরে থাকা চাচা, ফুফু, মামা-মামিরা এলে বাড়ি ভরে উঠত গল্পে আর হাসিতে। বড়রা আড্ডা দিত, আমরা ছোটরা দৌড়ঝাঁপ করতাম। একসাথে বসে খাওয়া—সেমাই, পায়েস, মাংস, পোলাও—সব মিলিয়ে যেন সুখের উৎসব।
শৈশবের ঈদ মানেই ছিল নিঃস্বার্থ আনন্দ। তখন কোনো দুঃশ্চিন্তা ছিল না, কোনো দায়িত্ব ছিল না। শুধু নতুন জামা, নতুন টাকা আর আনন্দে ভরা দিন। বন্ধুদের সাথে কে কতো সালামি পেয়েছে, কার জামা বেশি সুন্দর—এই ছোট্ট প্রতিযোগিতাও ছিল আনন্দেরই অংশ।
আজ বড় হয়ে বুঝি, ঈদের আসল সৌন্দর্য ছিল সেই একসাথে থাকা। এখন হয়তো আমরা অনেকেই দূরে থাকি, কাজের ব্যস্ততায় সময় পাই না। কিন্তু ঈদ এলে মনে পড়ে যায় সেই কাঁচা রাস্তা, সেই ঈদগাহ মাঠ, সেই মেলার নাগরদোলা, সেই মালাই আইসক্রিমের স্বাদ।
শৈশবের সেই দিনগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে হৃদয়ের গভীরে। ঈদ এলেই মন আবার ছোট হয়ে যায়। মনে হয়, আবার যদি বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যেতে পারতাম, আবার যদি নতুন জামা পরে বন্ধুদের দেখাতে পারতাম!
ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মিলনের আনন্দ, ভালোবাসার বার্তা আর শৈশবের অমূল্য স্মৃতির ভাণ্ডার। শৈশবের ঈদ আমাদের শিখিয়েছে ভাগাভাগি করতে, একসাথে হাসতে, একসাথে থাকতে। সেই স্মৃতিগুলোই আজও আমাদের মন ভরিয়ে রাখে।
ঈদ আসলেই তাই হৃদয়ে বাজে এক অন্যরকম সুর—শৈশবের সুর, গ্রামের সুর, পরিবারের সুর। আর আমরা মনে মনে বলি, “সেই দিনগুলো কতই না সুন্দর ছিল!”


Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post