সেই বর্ষার দিনগুলি ।। রণতোষ কুমার দেব

 



বর্ষা আমার কাছে শুধু একটি ঋতুর নাম নয়; বরং স্মৃতি, অনুভূতি আর জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। আষাঢ়ের প্রথম কালো মেঘ যখন আকাশজুড়ে ভেসে ওঠে, তখন আজও মন ফিরে যায় শৈশবের সেই দিনগুলিতে। মনে হয়, সময়ের স্রোত থেমে গেছে, আর আমি ফিরে গেছি গ্রামের সেই কাদামাখা পথ, বৃষ্টিভেজা মাঠ আর টিনের চালের ঘরের কাছে।
আমাদের গ্রাম ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব আশ্রয়। চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, পুকুর, বাঁশঝাড় আর মাটির সরু পথ। গ্রীষ্মের প্রখর রোদে যখন মাঠ-ঘাট শুকিয়ে যেত, তখন সবাই অপেক্ষা করত বর্ষার আগমনের। কৃষকের চোখে থাকত আশার আলো, আর শিশুদের মনে আনন্দের উচ্ছ্বাস।
একদিন দুপুরে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এল। বাতাসে ভেসে উঠল সোঁদা মাটির গন্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। আমি আর আমার বন্ধুরা ছুটে বেরিয়ে পড়লাম। মায়ের বারণ সেদিন আমাদের আটকে রাখতে পারেনি। বৃষ্টির জলে ভিজে, কাদায় মাখামাখি হয়ে, হাসতে হাসতে আমরা যেন খুঁজে পেয়েছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বর্ষার সময় গ্রামের খাল-বিল, পুকুর-ডোবা পানিতে ভরে উঠত। স্কুলে যাওয়ার পথে অনেক সময় হাঁটুসমান জল পার হতে হতো। তবু সেই কষ্টের মধ্যেও ছিল এক ধরনের আনন্দ। ছাতা হাতে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি আজও হৃদয়ে জাগরুক।
আমাদের বাড়ির টিনের চালের উপর বৃষ্টির শব্দ ছিল এক অনবদ্য সংগীত। রাতের নীরবতায় সেই ঝমঝম শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম, টেরই পেতাম না। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি আর মেঘের গর্জন ভয় জাগালেও বাবা-মায়ের স্নেহময় উপস্থিতি সব ভয় দূর করে দিত।
বর্ষার আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল কাগজের নৌকা। পুরোনো খাতা বা সংবাদপত্র দিয়ে নৌকা বানিয়ে আমরা জলে ভাসাতাম। কার নৌকা সবচেয়ে দূরে যাবে, তা নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। আজকের শিশুদের কাছে বিষয়টি হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে সেটাই ছিল আনন্দের এক বিশাল জগৎ।
বৃষ্টি পড়ার দিনে মায়ের রান্নাঘরেও যেন উৎসবের আবহ তৈরি হতো। গরম গরম খিচুড়ি, বেগুনি, আলুর চপ কিংবা ডালভাজা—এসব খাবারের স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি, আর ঘরের ভেতরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে খাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো আজও মনে গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।
তবে বর্ষা কেবল আনন্দের দূত ছিল না। কখনও কখনও অতিবৃষ্টিতে গ্রামের রাস্তা ডুবে যেত, মানুষের দুর্ভোগ বাড়ত, কৃষকের ফসল নষ্ট হতো। তখন বুঝতাম, প্রকৃতি যেমন মমতাময়ী, তেমনি প্রয়োজনে কঠোরও হতে পারে। এই উপলব্ধি আমাকে জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—সুখ ও দুঃখ একে অপরের পরিপূরক।
একবার টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে গ্রামের পাশের নদী ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। আমরা কয়েকজন বন্ধু নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তার উত্তাল রূপ দেখছিলাম। সেই দৃশ্য ছিল যেমন মোহময়, তেমনি ভীতিকরও। বাড়ি ফিরে বাবা বলেছিলেন, “প্রকৃতিকে ভালোবাসবে, কিন্তু তার শক্তিকেও সম্মান করবে।” বাবার সেই কথাগুলো আজও আমার জীবনের এক মূল্যবান শিক্ষা হয়ে আছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। গ্রামের মাটির পথ আজ পাকা রাস্তা। খেলার মাঠ ছোট হয়ে এসেছে। শৈশবের অনেক বন্ধু জীবনের প্রয়োজনে দূরে চলে গেছে। আমিও কর্মব্যস্ততার জগতে হারিয়ে গেছি। কিন্তু বর্ষা এলেই মন আবার ফিরে যায় সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কাছে।
এখন শহরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি। বৃষ্টির শব্দ শুনি, কিন্তু সেই টিনের চালের সুর আর পাই না। ভেজা মাটির গন্ধ পাই, কিন্তু শৈশবের সেই নির্মল আনন্দকে আর ছুঁতে পারি না। তবু প্রতিটি বর্ষা যেন স্মৃতির দুয়ার খুলে দেয়। মনে করিয়ে দেয় কাগজের নৌকা, কাদামাখা পা, বন্ধুদের হাসি আর মায়ের স্নেহমাখা ডাক।
জীবনের প্রতিটি ঋতুরই নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে, কিন্তু বর্ষা আমার হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। কারণ বর্ষা আমাকে শুধু প্রকৃতির রূপ দেখায়নি; দেখিয়েছে পরিবার, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং জীবনের সহজ-সরল আনন্দকে।
আজও যখন আকাশে কালো মেঘ জমে, যখন দূরে কোথাও বাজ পড়ে, যখন জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ শব্দ তোলে, তখন মনে হয় শৈশবের সেই দিনগুলো এখনও বেঁচে আছে। তারা লুকিয়ে আছে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায়, ভেজা মাটির প্রতিটি গন্ধে এবং স্মৃতির প্রতিটি পাতায়।
বর্ষা তাই আমার কাছে কেবল একটি ঋতু নয়; বরং জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন বৃষ্টির শব্দে, মেঘের ডাকে আর ভেজা বাতাসের স্পর্শে ফিরে ফিরে আসবে সেই সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি। আর আমি নীরবে বলব—সেই বর্ষার দিনগুলি, তোমরা চিরকাল আমার হৃদয়ে বেঁচে থেকো।

Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post