ঈদের জামা ।। ইমরান হোসাইন আদিব


ছোট দু'টি  ভাই-বোন। ওদের বসবাস এ চেনা শহরের কোনো এক জীবনময়ী নামের গলিতে।জীবনময়ী নামটা কেউ শৌখিনতার আদলে রাখলেও গলির পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট সম্পুর্ন ভিন্ন। সেই গলির বস্তিময় জায়গায় ওরা দু'জন  ভাই-বোন এতিম বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে দূর্ঘটনায় মা হারানো ছোট ভাই বোন দু'জন  গত বছরে বাবাকেও হারিয়েছে কলেরার প্রকোপে। রেখে গেলো শুধু এই স্বার্থপর পৃথিবীর সব স্বার্থপর লোকের ভিড়ে ঐ নিষ্পাপ শিশু দু'টিকে। জীবনের চরম সব সংগ্রাম ওদের এ বয়সেই চালিয়ে যেতে হয় বেঁচে থাকার তাগিদে। ১৩ বছর বয়সী ভাইয়ের ছোট বোনের বয়স ৭ বছর ছুঁইছুঁই। রোজ সকালে ঘুমন্ত বোনকে রেখে এক পেট ক্ষুদা নিয়ে ভাইটি বেড়িয়ে পড়ে ।মালিকের কাছ থেকে ডজন খানেক পত্রিকা, কোনদিন বা বেশ কিছু সতেজ গোলাপ  নিয়ে এক দৌঁড়ে চলে যায় যান্ত্রিক শহরের জনবহুল রাস্তা মোড়ে।ওকে দেখা যায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা সব গাড়ির জানালার ধার ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকতে। অপেক্ষায় থাকে কখন গাড়ির জানালা খুলবে আর ও সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে থাকা পত্রিকা বা ফুল উঁচিয়ে ধরে বলবে স্যার/আফা একটা পত্রিকা নেন, একটা গোলাপ নেন স্যার। এই ডাকে কেউ কেউ সাড়া দেয়, কেউ আবার বিরক্ত হয়ে তাড়িয়ে দেয়। এত সব অপমান গায়ে মাখে না সে। ও বুঝতে শিখেছে যে তার জন্মই হয়েছে এভাবে শোষিত হওয়ার জন্য। এভাবে চলতে থাকে ওর সন্ধ্যা অব্দি ছুটন্ত স্বভাব।দিনশেষে তার সংগ্রহ হয় কাগজের ও পয়সার সম্মিলিত কয়েকটা খুচরো টাকা যা ওদের দু'জনার ক্ষুধা নিবারনের একমাত্র সহায়।

স্বল্প টাকা আয় হলেও বোনটির পছন্দের খাবার,কলা-পাউরুটির নিত্য চাহিদা ভাইটি পুরন করে আসছে প্রতিদিন। বোনের মুখে এসব খাবার নিজ হাতে খাওয়াতে পেরে ভীষণ খুশি হয় সে। খাওয়া শেষে প্রতিরাতে বোনটি যখন ভাইকে জরিয়ে ধরে গালে চুমু খায় তখন ভাইয়ের চোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠে। হঠাৎ এক রাতে ঘুমানোর আগে ভাইকে জড়িয়ে  বোনটি কিছুটা আভিমানি সুরে বললো 
-ভাই?
-হ বল?
-গত বছর যে ঈদ টা গেলো না ঐ ঈদে তোর কাছে একটা জিনিস চাইছিলাম। তোর মনে আছে?
-হ মনে আছে
"আর মনেই বা থাকবেনা কেনো।একমাত্র বোনটির একটি নতুন জামার চাহিদা সে দারিদ্রতার কারনে পূরণ করতে পারে নি।অাশা দিয়েছে এ বছর ঈদে ছোট বোনকে সুন্দর একটা টুকটুকে নতুন জামা সে নিজ হাতে পরিয়ে দেবে।"

হাতে আর সময় নেই। গুণে দেখলো ঈদের আছে আর মাত্র তিন দিন। ভাইটির এখনো ছোট বোনটির জন্য জামা কেনার টাকা সংগ্রহ করা হয়নি ।এখনকার দিনে পত্রিকা ও ফুল কোনটাই তেমন আর বিক্রি হচ্ছে না। দিনশেষে হাতে পাওয়া স্বল্প পারিশ্রমিক দিয়ে দোকান থেকে বোনের জন্য কলা আর রুটি কিনতেই টাকা প্রায় শেষ। তার বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না।কারণ বাড়িতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বোন দৌঁড়ে এসে  ভাইকে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইবে -
ভাই, আমার ঈদের জামা কি এনেছিস ?
ভাইটি তখন মিথ্যা বাক্য শুনিয়ে বোনকে আশা দিয়ে রাখে এই বলে যে,
এইতো আর ক'টা  টাকা জোগাড় হলেই আমার ছোট বোনটির ঈদের জামা কেনা হয়ে যাবে।

না এভাবে আর নয়! 
যেভাবেই হোক বোনের নতুন জামা সে সংগ্রহ করবেই। মনের ভিতর একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা চেপে বসলো তার।

ভাইটির পুরো রাত অতিবাহিত হয় বিনিদ্রায়। ছোট বোন প্রতি রাতে তার ঘুমের ঘরে কল্পনা করে নতুন জামা পড়ে সে তার ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে -
ভাই, আমায় কেমন লাগছে ?
বলনা ভাই ! 
এ ভাই, কেমন লাগছে আমায় নতুন জামাতে? 

মাঝরাতে এভাবে জল্পনা কল্পনা করতে করতে ভাই-ভাই বলে বোনটি চিৎকার দিয়ে ওঠে ।সকালে প্রতিদিনের ন্যায় আজও ভাইটি বেড়িয়ে পড়েছে যান্ত্রিক শহরের বুকে। উদ্দেশ্য একটাই বোনটির ঈদের জামা কেনার টাকা সংগ্রহ করা।

ছোট বোনটিও আজ রাস্তায় বেড়িয়ে পড়েছে । 
তার ছোট্ট দু'চোখে এ শহরকে দেখতে।
ছোট ছোট অসংখ্য ছেলে-মেয়ে তাদের  বাবা-মার কোলে করে, কেউ বা হাত ধরে হাঁটছে এ শহরের রাস্তা দিয়ে। এসব দেখে বোনটির খুব একটা আফসোস বা দুঃখ হয়না, কেননা তার মা-বাবার অভাব ছোট থেকে ওর বড় ভাই পূরন করে আসছে। বোনটির মন আজ ভীষণ খুশি।কারণ আজকের দিন পেরোলেই ঈদ। ভাই তার জন্য নতুন জামা নিয়ে আসবে যেটা পড়ে ও অন্য সবার মতো জীবনময়ী গলিতে  হেসে-খেলে ছুটবে। আর সবাইকে বলবে এই দেখো আমার নতুন জামা, এটা আমার ভাই আমায় কিনে দিয়েছে।

এদিকে বিকাল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। হাতে ৭৩ টাকা! আরও এক বার গুনে দেখলো ঐ ৭৩ টাকাই। মনের ভিতর শুধু একটা অস্থিরতা আর হতাশা বিরাজমান। সে কি পারবে তার একমাত্র ছোট্ট বোনটির জন্য একটি নতুন জামা কিনে এই ঈদে বোনের মুখে হাসি ফোটাতে!

আজ দুপুর বেলায় একটা দোকানে গিয়ে চুপি চুপি দোকান মালিকের কাছে থেকে ওর বোনের শরীরে বেশ মানাবে এমন একটি জামার দাম শুনেছে। দাম তেমন বেশি না, তবে ভাইয়ের কাছে তা পাহাড় সমতুল্য। ৩৩০ টাকা হলে সে ওর বোনের জন্য জামাটি কিনতে পারবে। অথচ হাতে মাত্র ৭৩  টাকা! ভাগ্যও যেন আজ তার সাথে এক পৈশাচিক খেলায় মেতেছে!
ওর মাথা ঘুরছে, সব অবসাদ আর ক্লান্তি ওকে ঘিরে ধরেছে। রাত পেরোলেই কাল ঈদ, হাতে আর একটি মাত্র রাত। জোগাড় হয়েছে মাত্র ক'টা টাকা। বাকি টাকা কি জোগাড় করতে পারবে??

সে যেন কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছেনা। কয়েকজন লোকের কাছে বাধ্য হয়ে হাত পেতে কিছু টাকা চেয়েছিল জামা কেনার জন্য। তার ডাকে কেউ তেমন সাড়া দেয় নি। উল্টো  তার বলা কথা গুলোকে নিয়ে উপহাস করেছে। 
তার চিৎকার দিয়ে এ শহরকে বলতে ইচ্ছে হয় "আমায় কিছু টাকা দাও আমি আমার ছোট্ট বোনটির ঈদের জামা কিনব।"
ভাইটি'র এই আত্মচিৎকার  স্বরনালি বেয়ে  বেড়িয়ে আসার সময় মুখের ভিতরেই আটকা পড়ে যায়। বাইরে বেড়িয়ে  এ শহরকে জানাতে পারেনা। এ শহরের শ্রবণ থলিতে পৌঁছাতে পারেনা ওর কিছু টাকা চাওয়ার  তীব্র আকুতি।

সন্ধ্যার প্রায় নিভু-নিভু পরিবেশ রাতকে বরণ করে নিতে ব্যস্ত।ভাইটি প্রায় হিতাহিতজ্ঞান শুন্য হয়ে পড়েছে। চোখের সামনে শুধু ভাসছে ওর ছোট্ট বোনের আবদার মাখা মুখ। হঠাৎ রাস্তার মোড়ে একটা পোষাকের দোকানে ওর নজর চলে গেলো। তখন ওর ভিতর হতাশার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।দোকানের সামনে তার বোনের বয়সী একটা বাচ্চা মেয়ের হাতে  সদ্য কেনা একটা জামার ব্যাগ শোভা পাচ্ছে। তার মস্তিষ্ক যেন আজ নীতিবোধ হীন হয়ে পড়েছে।
নিজেকে আর কিছু ভাবার সময় না দিয়ে এক দৌঁড়ে মেয়েটির শরীর ঘেঁষে তার হাতে থাকা ব্যাগটা কেড়ে নিল। সে ১৩ বছরের কিশোর বালক, তার দৌড়ের দ্রুততা আর বা কতই!মেয়েটির মার মুখে চোর চোর চিৎকারে আশে পাশের লোক সজাগ হয়ে গেলো। প্রাপ্তবয়স্ক কয়েকজন  ব্যক্তির দৌঁড়ের গতির কাছে ও হার মানলো।পিঠের উপর একটা প্রকাণ্ড হাতের আঘাত ওকে মাটিতে ফেলে দিল। আঘাত পেয়ে তাৎক্ষনিক ভাবে ঠোঁট কেটে রক্ত বের হতে লাগলো। আশেপাশে লোক জড়ো হতে বেশি সময় লাগলো না এমন দৃশ্য দেখে পৈশাচিক আনন্দ নিতে। কয়েকটা হাত ওর ছোট কোমল দেহের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে লাগলো অবিরত।এমন আঘাতে ও যখন প্রায় কেঁকিয়ে উঠবে ঠিক ঐ মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো বোনটির আদরমাখা মুখ। কেঁকিয়ে ওঠার শব্দ গুলো স্বরযন্ত্রেই থেমে গেলো।
ব্যাগটাকে শক্ত করে ধরে রাখার ক্ষমতা ওর আর নেই। শিশুটির মা ওর হাত থেকে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে যোগ করলো বেশ কিছু  চড়-থাপ্পর ও বঞ্চনা। কেউ একজন ওকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার কথা বলতে লাগলো।কেউ আবার ঈদের কথা ভেবে ওকে ছেড়ে দিতে বললো। অথচ একটি বারের জন্যও কেউ জানতে চাইলো না কেন সে এমন করলো! সত্যি বলতে এ শহরের বাসিন্দা যারা সেখানে উপস্থিত ছিলো এমন কেউই তখন তার প্রতি এতটুকু সহানুভুতির দৃষ্টি দেয় নি বরং হিংস্র ও বর্বতার পরিচয় দিয়েছে।

সেখান থেকে ও ফিরে এলো খালি হাতে, দেহে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন নিয়ে।
এদিকে বোনের চোখে ঘুম নেই।এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাড়ির গেটের মুখে। কখন ভাইয়া আসবে, বোন বলে ডাকবে একটা টুকটুকে জামা হাতে!
তখন বোনটি দৌঁড়ে ভাইকে জরিয়ে ধরে কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলবে,
দে দে আমার ঈদের জামা দে ভাই!
ভাইটি কিছুক্ষন পর গেটের কাছে ঠিকই পৌঁছাল তবে বোন বলে ডাক দেয়ার
আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।

বোনটি হতভম্ব হয়ে দেখছিলো ভাইয়ের মাটিতে পড়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য। যখন বাস্তবতায় ফিরলো তখন দৌঁড়ে এসে ভাইকে জরিয়ে ধরে ওঠতে সাহায্য করলো। উঠানে ভাইকে বসিয়েই ভাইয়ের কপালে হাত দিয়ে যখন রক্তের অস্তিত্ব অনুভব করলো তখন অবাক হয়ে জিজ্ঞেষ করলো ভাই তোর কপালে রক্ত??
না বোন ও কিছু না।

পরবর্তি বাক্যটা বলার আগেই ওর চোখে জল জমে গেলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বোনটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো বোন তোর ঈদের জামা আমি আনতে পারি নি!
আমায় ক্ষমা করে দে!
চুপচাপ বোনটি ওখান থেকে ওঠে গিয়ে ফিরলো হাতে একবাটি পানি আর জল পট্টি নিয়ে। অশ্রুমাখা কণ্ঠে বললো আমার জামা লাগবেনা ভাই,
আমার পাশে সবসময় তোকে চাই।

অতঃপর ভাই-বোন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলো কিছুটা প্রশান্তির আশায়। 


 ইমরান হোসাইন আদিবের জন্ম জন্ম ২০০০ সালের ০৯ মার্চ রংপুর জেলার পীরগণ্জ উপজেলার লালদিঘি মেলা গ্রামে। বাবা মোঃ আব্দুল লতিফ মন্ডল, মা মোছাঃ মমতাজ বেগম। 
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রক্তের গ্রুপঃ বি পজিটিভ (B +ve) 


Post a Comment

মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।

Previous Post Next Post

আপনিও লেখুন বর্ণপ্রপাতে

ছড়া-কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ( শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোকসাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, দর্শন, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমাজ, বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা ও প্রবন্ধ), উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, গ্রন্থ ও সাহিত্য পত্রিকার আলোচনা ও সমালোচনা, চিঠি, সাহিত্যের খবর, ফটোগ্রাফি, চিত্রকলা, ভিডিও ইত্যাদি পাঠাতে পারবেন। ইমেইল bornopropat@gmail.com বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ।